বিশ্বে তেলের মজুতে শীর্ষে ভেনেজুয়েলা (World’s Largest Oil Reserves)
২০২৩ সালের তথ্যমতে, মার্কিন ‘এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (EIA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এটি বিশ্বের মোট মজুতের প্রায় ২০ শতাংশ। ভেনেজুয়েলা বর্তমানে সৌদি আরবকে (২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল) টপকে বিশ্বের ১ নম্বর তেল সমৃদ্ধ দেশ। অথচ বিশাল ভাণ্ডার থাকলেও উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে তলানিতে।
মজুতের পরিমাণ অনুযায়ী প্রথম দশটি দেশ হলো:
- ভেনেজুয়েলা (Venezuela): ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।
- সৌদি আরব (Saudi Arabia): ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল।
- ইরান (Iran): ২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল।
- ইরাক (Iraq): ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল।
- কুয়েত (Kuwait): ১০২ বিলিয়ন ব্যারেল।
- রাশিয়া (Russia): ৮০ বিলিয়ন ব্যারেল।
- লিবিয়া (Libya): ৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল।
- যুক্তরাষ্ট্র (USA): ৪৮ বিলিয়ন ব্যারেল।
- নাইজেরিয়া (Nigeria): ৩৮ বিলিয়ন ব্যারেল। (এছাড়া ৩০ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে কাজাখস্তান ও ২৮ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে চীন ১০ম ও ১১তম অবস্থানে রয়েছে)।
উৎপাদন ও রপ্তানির করুণ দশা (Oil Production & Export Crisis)
এক সময় দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৬ সালের শুরুতে তা দৈনিক মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
প্রধান ক্রেতা: ভেনেজুয়েলার তেলের ৬৮ শতাংশ কেনে চীন (China), এবং ২৩ শতাংশ কেনে যুক্তরাষ্ট্র (USA)।
ওরিনোকো বেল্ট: দেশটির বেশিরভাগ তেল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওরিনোকো বেল্টে (Orinoco Belt) অবস্থিত, যা পরিশোধন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
আরও পড়ুন:
সোনালী অতীত বনাম বর্তমান বিপর্যয় (Production History: Past vs Present)
২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতা গ্রহণের আগে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ছিল বর্তমানের দ্বিগুণেরও বেশি।
বিগত দশকের চিত্র: দেশটি সমাজতান্ত্রিক ধারায় যাওয়ার আগে দৈনিক উৎপাদন ছিল ৩৫ লাখ ব্যারেল।
মাদুরো আমল: ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে উৎপাদন ৭৫ শতাংশের বেশি কমে যায়।
সাম্প্রতিক উন্নতি: ২০২০ সালে দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল মাত্র ৫৬৯ হাজার (৫.৬৯ লাখ) ব্যারেল। এরপর ধাপে ধাপে বেড়ে ২০২৪ সালে তা ৯২১ হাজার (৯.২১ লাখ) ব্যারেলে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের শুরুতে এটি ১ মিলিয়নের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
উৎপাদন কমার মূল কারণসমূহ (Reasons for Production Decline)
বিশাল মজুত থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলার এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে কাজ করছে তিনটি বড় সমস্যা:
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিষেধাজ্ঞা: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির তেল বিক্রি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অবকাঠামোগত সংকট: দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তেলক্ষেত্রগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে।
তেলের প্রকৃতি: ভেনেজুয়েলার তেল মূলত ‘এক্সট্রা হেভি ক্রুড’ (অতি ঘন)। এটি উত্তোলন এবং পরিশোধন করা সাধারণ তেলের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল প্রযুক্তি সাপেক্ষ।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ (Trump's Plan & Future)
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার এই ‘ভাঙাচোরা’ তেল অবকাঠামো সংস্কারে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। যদি মার্কিন প্রযুক্তি ও মূলধন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে উৎপাদন পুনরায় ৩৫ লাখ ব্যারেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভেনেজুয়েলার তেলের দখল কার হাতে? চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হিসাব ও বিশ্ববাজারের ভবিষ্যৎ
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দেশটির বিশাল তেল ভাণ্ডারের গন্তব্য কোথায়? বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর চীনের একক আধিপত্য থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হস্তক্ষেপ সেই সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা কারা? (Major Buyers of Venezuelan Oil)
তেলের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে ভেনেজুয়েলা বিকল্প বাজার তৈরি করেছে।
চীন (China): বর্তমানে দেশটির তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন, যা মোট রপ্তানির ৬৮ শতাংশ। মূলত স্বল্প মূল্যে এবং ঋণের বিনিময়ে চীন এই তেল সংগ্রহ করে।
যুক্তরাষ্ট্র (USA): ২৩ শতাংশ তেল কেনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এখনও দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। শেভরন (Chevron)-এর মতো কোম্পানিগুলো বিশেষ অনুমতির আওতায় এই তেল আমদানি করে আসছে।
অন্যান্য দেশ: স্পেন ও কিউবা (৪%), সিঙ্গাপুর (০.৫%), মালয়েশিয়া (০.৩%) এবং রাশিয়া (০.২%) সামান্য পরিমাণ তেল কেনে।
আরও পড়ুন:
তেলের দামে কি আগুন লাগবে? (Impact on Global Oil Prices)
ভেনেজুয়েলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযানের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই দাম আকাশচুম্বী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিশেষজ্ঞের মত: ওয়াশিংটনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপ-এর প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি (Bob McNally) সিএনএনকে জানিয়েছেন, যতক্ষণ না ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা বা গৃহযুদ্ধ দেখা দিচ্ছে, ততক্ষণ তেলের দামে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
আরও পড়ুন:
বাজারের বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় বাজার এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে পরিস্থিতি ‘মেসি’ বা জটিল হয়ে উঠলে তা ভিন্ন মোড় নিতে পারে।
রুশ হস্তক্ষেপের শঙ্কা (Possibility of Russian Intervention)
মাদুরোকে আটকের পর রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাশিয়া ভেনেজুয়েলার তেলের বড় ক্রেতা না হলেও দেশটির তেল শিল্পে তাদের বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। ক্রেমলিন এরইমধ্যে এই হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।





