কীভাবে চলে আধুনিক বুলেট ট্রেন?

বুলেট ট্রেন
বুলেট ট্রেন | ছবি: সংগৃহীত
0

চাকার নিচে খটখট শব্দ আর কালো ধোঁয়া উড়িয়ে চলা ট্রেনের দিন পেরিয়ে আধুনিক বিশ্ব এখন উড়ন্ত গতির বুলেট ট্রেনের (Bullet Train) যুগে। সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে চলা ট্রেনকে ‘হাইস্পিড’ বা বুলেট ট্রেন বলা হয় (What is high speed train)। দূরপাল্লার যাত্রায় অত্যন্ত আরামদায়ক, নিখুঁত সময়ানুবর্তিতা এবং সাশ্রয়ী যাতায়াতের (Affordable transportation) জন্য এটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কিন্তু বিজ্ঞানের এই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারটি কীভাবে এত প্রচণ্ড গতিতে নিরাপদে ছুটে চলে, তা সত্যিই এক বিস্ময়।

ইতিহাসের শুরু শিনকানসেন দিয়ে (History of Shinkansen Bullet Train)

বুলেট ট্রেনের ধারণাটি (Concept of bullet train) প্রথম বাস্তবে রূপ দেয় জাপান। ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকের সময় তারা বিশ্বের প্রথম উচ্চগতির ট্রেন লাইন ‘টোকাইদো শিনকানসেন’ (Tokaido Shinkansen) চালু করে। এই ট্রেনের সামনের অংশ দেখতে অনেকটা বন্দুকের গুলির মতো হওয়ায় বিশ্বজুড়ে এটি ‘বুলেট ট্রেন’ নামে পরিচিতি পায়। প্রথম অবস্থায় এর গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১০ কিলোমিটার, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাধারণ ট্রেনের সঙ্গে পার্থক্য ও চালিকাশক্তি (Difference Between Normal Train and Bullet Train)

সাধারণ ট্রেনের চেয়ে বুলেট ট্রেনের প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি মূলত দুটি প্রধান প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে চলে।

বিদ্যুত ও অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন (প্রথাগত চাকাযুক্ত ট্র্যাক): অধিকাংশ বুলেট ট্রেন বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা ট্রেনের ওপরে থাকা ‘প্যান্টোগ্রাফ’র (Train pantograph) মাধ্যমে ওভারহেড লাইন থেকে সংগৃহীত হয়। এই বিদ্যুৎ শক্তি ট্রেনের শক্তিশালী ইলেকট্রিক মোটরকে সচল করে সরাসরি চাকা ঘোরে।

উচ্চগতিতে বাতাসের বাধা কমাতে এর ‘অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন’ (Aerodynamic train design) বা সামনের সুচালো নাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— জাপানের শিনকানসেন ট্রেনের সামনের অংশটি মাছরাঙা পাখির ঠোঁটের মতো লম্বা এবং সুচালো। এই বিশেষ নকশা বাতাসের ঘর্ষণ কমায় এবং ট্রেন যখন উচ্চগতিতে কোনো সুড়ঙ্গ বা টানেল থেকে বের হয়, তখন বাতাসের চাপের কারণে সৃষ্ট বিকট শব্দ বা ‘টানেল বুম’ (Tunnel boom effect) হ্রাস করে।

আরও পড়ুন

এছাড়া, ঝরঝরে ও মসৃণ চলাচল নিশ্চিত করতে এর ট্র্যাকে কোনো ফাঁক বা জয়েন্ট ছাড়া ‘ওয়েল্ডেড রেল’ (Continuous welded rail) ব্যবহার করা হয়। মোড় নেয়ার সময় গতি না কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে এতে রয়েছে ‘অ্যাক্টিভ সাসপেনশন’ (Active suspension system) এবং ‘তিল্টিং টেকনোলজি’ (Tilting train technology), যা বাঁক নেয়ার সময় সেন্সরের মাধ্যমে ট্রেনের শরীরকে সামান্য কাত করে দেয়।

ম্যাগলেভ প্রযুক্তি -চৌম্বকীয় ভাসমান ট্রেন (Maglev Train Technology) : আধুনিক অনেক বুলেট ট্রেন চলে ‘ম্যাগনেটিক লেভিটেশন’ বা ম্যাগলেভ প্রযুক্তিতে (Magnetic levitation train)। এটি চৌম্বকীয় বিকর্ষণ নীতি ব্যবহার করে কাজ করে, যেখানে ট্র্যাকের এবং ট্রেনের শক্তিশালী চুম্বকগুলো একে অপরকে বিকর্ষণ করে ট্রেনটিকে লাইন থেকে ১ থেকে ১০ সেন্টিমিটার ওপরে ভাসিয়ে রাখে। চাকা ও লাইনের মাঝে কোনো ঘর্ষণ না থাকায় এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের আকর্ষণ ও বিকর্ষণ বলকে কাজে লাগিয়ে ট্রেনটি বাতাসে ভেসে ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে পারে।

শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ‘এটিসি’ (Automatic Train Control System)

এত উচ্চগতির ট্রেনে দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যবহৃত হয় ‘অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোল’ বা এটিসি (Automatic Train Control ATC) সিস্টেম। এই আধুনিক সিগন্যালিং সিস্টেমটি ট্রেনের গতি এবং অবস্থান সার্বক্ষণিক মনিটর করে। যদি কোনো কারণে ট্রেন নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করে, তবে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক প্রয়োগ করে গতি কমিয়ে দেয় বা ট্রেনটিকে থামিয়ে দেয়।

বিশ্বজুড়ে বুলেট ট্রেন ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট (Bullet Train in Bangladesh and World Context)

জাপানের সাফল্যের পর বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে চীন, যাদের ‘ফুশিং হাও’ (Fuxing Hao train) ট্রেনগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল। এছাড়া ফ্রান্সের টিজিভি, জার্মানির আইস এবং ইতালির ট্রেনগুলো ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতও জাপানি প্রযুক্তির সহায়তায় মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন (Mumbai Ahmedabad bullet train project) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

বুলেট ট্রেন কেবল দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যমই নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক। এটি দূরবর্তী শহরগুলোকে একে অপরের কাছে এনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে বুলেট ট্রেন (Bullet train in Bangladesh) চালুর উদ্যোগ বেশ কয়েকবার নেয়া হলেও নানা জটিলতায় সেই কাজ এখনও আলোর মুখ দেখেনি। তবে ভবিষ্যতের যানজট ও দূষণমুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য বুলেট ট্রেনই একমাত্র আদর্শ সমাধান।

একনজরে আধুনিক বুলেট ট্রেনের চালিকাশক্তি ও প্রযুক্তি (Modern Bullet Train Mechanics & Technology at a Glance)

মূল প্রযুক্তি
(Core Technology)
কার্যপদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
(How it Works & Scientific Explanation)
প্রধান সুবিধা
(Key Benefit)
বিদ্যুৎ ও প্যান্টোগ্রাফ
(Electric Power & Pantograph)
ট্রেনের ছাদে থাকা ‘প্যান্টোগ্রাফ’ ওভারহেড ক্যাবল থেকে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে ট্রেনের শক্তিশালী ইলেকট্রিক মোটর সচল রাখে, যা সরাসরি চাকা ঘুরায়। জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত চলাচল
অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন
(Aerodynamic Design)
পাখির ঠোঁটের মতো সুচালো ও লম্বা সামনের অংশ বাতাসের ঘর্ষণ কমায়। এটি ট্রেন টানেল থেকে বের হওয়ার সময় বাতাসের প্রচণ্ড চাপের বিকট শব্দ বা 'টানেল বুম' হ্রাস করে। তীব্র গতি বৃদ্ধি ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ
ম্যাগলেভ প্রযুক্তি
(Maglev Technology)
চৌম্বকীয় বিকর্ষণ বল ব্যবহার করে ট্রেনটিকে ট্র্যাক থেকে ১-১০ সেমি ওপরে ভাসিয়ে রাখা হয়। চাকা ও লাইনের ঘর্ষণ না থাকায় ট্রেন বাতাসে ভেসে তীব্র গতিতে ছুটে চলে। ঘণ্টায় ৫০০-৬০০ কিমি পর্যন্ত সর্বোচ্চ গতি অর্জন
তিল্টিং ও ওয়েল্ডেড ট্র্যাক
(Tilting & Welded Rail)
কোনো ফাঁক ছাড়া মসৃণ 'ওয়েল্ডেড রেল' কম্পন কমায় এবং বাঁক নেওয়ার সময় 'তিল্টিং টেকনোলজি' সেন্সরের মাধ্যমে ট্রেনের বডিকে সামান্য কাত করে গতি ধরে রাখে। মোড়ে গতি না কমিয়ে মসৃণ ও আরামদায়ক যাত্রা
এটিসি কন্ট্রোল সিস্টেম
(Automatic Train Control)
অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোল (ATC) সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনের গতি ও অবস্থান মনিটর করে। গতিসীমা লঙ্ঘন করলে এটি নিজে থেকেই ব্রেক চেপে ট্রেন থামিয়ে দেয়। শতভাগ দুর্ঘটনা ও ঝুঁকিমুক্ত নিরাপত্তা

এনএইচ