আজ (সোমবার, ৩০ মার্চ) ঢাকার সিরডাপ (CIRDAP) মিলনায়তনে ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’ থিঙ্ক-অ্যান্ড-ডু ট্যাঙ্ক কর্তৃক আয়োজিত ‘নির্ভরশীলতা থেকে সার্বভৌমত্ব: ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ রোডম্যাপ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গবেষণার ফল উপস্থাপন করা হয়।
সেইসঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে ২০২৬ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে করপোরেট ও বিকেন্দ্রেীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ কাঠামো উপস্থাপন করা হয়।
উল্লেখ্য, এ গবেষণায় ২০৪০ সালের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা তিনগুণ বেড়ে প্রতি ঘণ্টায় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ গিগাওয়াট হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা সময়মতো বাড়াতে ব্যর্থ হলে তা সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনের সুযোগ নস্যাৎ করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রচলিত ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ জ্বালানি মডেলটি তার আর্থিক এবং কারিগরি সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছেছে বলেও জানা যায়। এ গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান এবং সহ-গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এম. মোফাজ্জল হোসেন, সামিরা বাশার রোজা ও কাজী কারিনা আরিফ।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ. কে. এনামুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরকে আশাবাদ থেকে বাস্তববাদে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, খণ্ডিত শাসন ব্যবস্থা এবং নিম্ন দক্ষতার কারণে স্থাপিত সক্ষমতা প্রকৃত উৎপাদনে রূপান্তরিত হচ্ছে না। প্রকৃত সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য আমাদের একটি কেন্দ্রীয় মডেল থেকে গ্রাম-পর্যায়ের বিকেন্দ্রীকৃত সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে হবে।’
এছাড়া বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পরিচালক (যুগ্ম সচিব) দিদারুল আলম বলেন, ‘আমদানিকৃত গ্যাস ও কয়লার ওপর আমাদের নির্ভরতা আমাদের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিচ্ছে। প্রকৃত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের জন্য কেবল নীতির চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন; এটি দেশিয় সম্পদ সংগ্রহ এবং মাল্টি-বায়ার মার্কেটের দিকে একটি পূর্ণ পরিবর্তনের দাবি রাখে।’
গবেষণার মূল তথ্যসমূহ এক নজরে—
মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন: বিদ্যুৎ খাতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ন্যায্য রূপান্তরের জন্য ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
পর্যায়সমূহ: এ বিনিয়োগ দু’টি পর্যায়ে বিভক্ত, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তীতে ২০৩১-২০৪০ সময়কালে ২৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে ১৭ ডলারের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে আগামী ১৫ বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৫৫৭ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রিক সুফল যুক্ত হবে, যা বছরে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সমান।
মোট সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা: ২০৪০ সালের মধ্যে ২১ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্জনের লক্ষ্য। এর মধ্যে শিল্পকারখানার ছাদ থেকে ১২ হাজার ৪৮ মেগাওয়াট, কৃষকদের জন্য সোলার সেচ থেকে ৩ হাজার ৪৪২ মেগাওয়াট এবং নদী ও জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১ হাজার ৭২১ মেগাওয়াট অন্তর্ভুক্ত।
ভূমির প্রভাব: এ পরিকল্পনায় কোনো কৃষিজমির প্রয়োজন নেই। কারখানার বিদ্যমান ছাদ এবং জলাধার ব্যবহারের মাধ্যমে এই রোডম্যাপ ৬০ হাজার একর উর্বর কৃষিজমি রক্ষা করবে, যা নিশ্চিত করবে যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেন খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নামে।
গ্রিড স্থিতিশীলতা (স্টোরেজ): ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের (বিইএসএস) জন্য নির্দিষ্টভাবে ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ‘স্থিতিশীলতা প্রিমিয়াম’ দিনের বেলা উৎপন্ন সৌরবিদ্যুৎ জমা রাখার জন্য অপরিহার্য, যাতে তা সন্ধ্যার পিক আওয়ারের সময় ব্যবহার করা যায়।
অপচয় হ্রাস: নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হওয়া বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ করতে সাহায্য করবে। এটি অতিরিক্ত দামের জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তিগুলো টিকিয়ে রাখতে বর্তমানে প্রয়োজনীয় বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকির সমস্যাও সমাধান করবে।





