স্বপ্ন ছিলো উচ্চশিক্ষা, দালালের প্যাঁচে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যু হলো মুহিবুরের

মুহিবুর রহমান
মুহিবুর রহমান | ছবি: সংগৃহীত
1

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন মৌলভীবাজারের তরুণ মুহিবুর রহমান (২৩)। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় যুদ্ধের ময়দানে। দালালের প্রলোভনে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে গিয়ে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান তিনি। সপ্তাহখানেক আগে মারা গেলেও গতকাল (সোমবার, ২০ এপ্রিল) বিষয়টি জানাজানি হয়।

মুহিবুর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সম্পদপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মসুদ মিয়ার ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মুহিবুর এইচএসসি ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মেক্সিকোতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কোনো কারণে তার ভিসা বাতিল হয়ে গেলে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং এক দালালের খপ্পরে পড়েন।

দালালরা তাকে প্ররোচনা দেয় যে, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে ভালো বেতন পাওয়া যাবে এবং যুদ্ধ শেষে মিলবে রাশিয়ার নাগরিকত্ব।

আরও পড়ুন:

সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে মুহিবুর রাশিয়ায় পাড়ি জমান। যে ছেলের হাতে উচ্চশিক্ষার জন্য কলম থাকার কথা ছিল, পরিস্থিতির শিকার হয়ে তার হাতে উঠে আসে মরণাস্ত্র। দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে তাকে পাঠানো হয় সম্মুখ যুদ্ধে।

দীর্ঘদিন রাশিয়ার হয়ে লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান তিনি। রাশিয়ান সৈনিকদের খাবার সরবরাহকারী এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারটি প্রথম মৃত্যুর খবর পায়।

মুহিবুর একটি বাঙ্কারের ভেতরে অবস্থান করছিলেন, কিন্তু ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বাঙ্কারটি বিধ্বস্ত হলে তিনি মারা যান। তবে ঠিক কবে তার মৃত্যু হয়েছে তা পরিবারটি নিশ্চিত করতে পারেনি।

আরও পড়ুন:

এদিকে রাশিয়ার বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিহত সৈনিকদের মরদেহ সাধারণত নিজ দেশে পাঠানো হয় না। মরদেহগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরিয়ে ফেলা হয় বা গণকবর দেয়া হয়। ফলে মুহিবুরের মরদেহ দেশে ফেরত পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গিয়ে অকালে প্রাণ হারানো মুহিবুরের মৃত্যুতে তার পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সোমবার রাতে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন আমতৈল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. ইকবাল আহমদ।

পরিবারের বরাতে ইউপি সদস্য মো. ইকবাল আহমদ জানান, উচ্চশিক্ষার আশায় মেক্সিকোতে পাড়ি জমান মুহিবুর। কিন্তু সেখানে ভিসা বাতিল হয়ে গেলে তার জীবন হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই সংকটময় সময়ে দালাল চক্র তাকে টার্গেট করে। তারা প্রলোভন দেখায় রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে মোটা অঙ্কের বেতন ও যুদ্ধ শেষে নাগরিকত্ব মিলবে। ভবিষ্যতের আশায় সেই প্রলোভনে সাড়া দেন তিনি।

আরও পড়ুন:

এরপর রাশিয়ায় গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং তাকে পাঠানো হয় সম্মুখ যুদ্ধে। দীর্ঘদিন রুশ বাহিনীর হয়ে লড়াই করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

তিনি পরিবারের বরাতে আরও জানান, একটি বাঙ্কারে অবস্থানকালে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় সেটি বিধ্বস্ত হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মুহিবুর। রাশিয়ান সেনাদের জন্য খাবার সরবরাহকারী এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথমে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছায়। তবে ঠিক কবে তিনি নিহত হয়েছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে আজ (মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল) দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব হোসেন জানান, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন গত এক সপ্তাহ আগে সেখানে মারা গিয়েছেন। মূলত লেখাপড়ায় গিয়ে প্রলোভনে পড়ে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

গতকাল সোমবার তার বাড়িতে খবর এলে তারা নিশ্চিত হন। তবে পরীক্ষা থাকায় এখনো তিনি নিহতের বাড়িতে যেতে পারেননি।

এসএস