বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্র; জাতিসংঘে ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাশ

বিশ্ব মানচিত্র
বিশ্ব মানচিত্র | ছবি: সংগৃহীত
0

বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্র। শত শত বছর ধরে প্রচলিত মানচিত্রে মহাদেশগুলোর সঠিক আকার তুলে ধরা হয়নি। ইউরোপকে বড় করে দেখানো হলেও আফ্রিকা বা এশিয়াকে এতোদিন দেখানো হয়েছে ছোট করে। যার প্রভাব পড়েছে মানুষের মনে। আফ্রিকার বিশালতা আড়াল করার এ বৈষম্য দূর করতে ঐতিহাসিক এক প্রস্তাব পাশ হয়েছে জাতিসংঘে। যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করলেও সমর্থন দিয়েছে বিশ্বের ১৬৪টি দেশ। জম্মু-কাশ্মীরকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের দাবি জানিয়েছে ভারত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় নাবিকদের সুবিধার জন্য ১৫৬৯ সালে বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেন জেরার্ডাস মারকেটর। সোজা পথে দিকনির্ণয়ে এ মানচিত্র ছিলো দারুণ কার্যকর। তবে দিক ঠিক রাখতে গিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তনে দেখা দেয় গরমিল। বিষুবরেখা থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির আকার বাড়তে থাকে। যা শত শত বছর ধরে চলে আসছে।

মার্কেটর মানচিত্রে প্রায় সমান মনে হলেও, গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় আফ্রিকা মহাদেশ ১৪ গুণ বড়। একইভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেও অনেক বড় করে দেখানো হয়। ভূখণ্ডের এ বিকৃতির মাধ্যমে আফ্রিকাকে বিশ্বের প্রান্তিক অঞ্চল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ আফ্রিকার দেশগুলোর। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকার আসল বিশালতা আড়ালেই রয়ে গেছে। আকারে ছোট হয়েও মানুষের মনে ইউরোপ আর আমেরিকার প্রভাব খুব বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, ২০১৮ সালে তৈরি ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন প্রতিটি জায়গায় সঠিক অনুপাত তুলে ধরে। মানচিত্রের এই বৈষম্য দূর করতে জাতিসংঘে ঐতিহাসিক একটি প্রস্তাব দেয় আফ্রিকার দেশগুলো। পুরনো মানচিত্রের বদলে ২০১৮ সালে উন্মোচিত নতুন মানচিত্র গ্রহণের আবেদন জানায় আফ্রিকা ইউনিয়ন। যেখানে ইউরোপের আকার সংকুচিত হবে। আর বাড়বে আফ্রিকা ও ভারতবর্ষের আকার। এ প্রস্তাবের নেতৃত্ব দেয় আফ্রিকার দেশ টোগো।

টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসাই বলেন, ‘প্রস্তাবের অনুমোদনটি আফ্রিকা ও গোটা বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি বিশ্বকে আরও নির্ভুল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ভৌগোলিকভাবে বিশ্বস্ত হিসেবে উপস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাকে নিশ্চিত করে। মানচিত্র নিঃসন্দেহে একটি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, তবে এটি জ্ঞান ও উপস্থাপনার এমন একটি মাধ্যম যা মহাদেশগুলোকে মানুষ কীভাবে দেখে, তা নির্ধারণ করে।’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি ১৬৪ ভোটে পাস হয়েছে। একমাত্র বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্র এর তীব্র সমালোচনা করেছে। ভোটদানে বিরত ছিলো ৬টি দেশ। যা আফ্রিকা মহাদেশের এক ঐতিহাসিক বিজয়। ফ্রান্সের মতে, পুরনো মানচিত্র সংশোধনের সময় এসেছে। ইউক্রেন সমর্থন দিলেও, তাদের দখলকৃত অঞ্চল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে তারা।

এদিকে, জাতিসংঘ-সমর্থিত প্রস্তাবিত বিশ্ব মানচিত্রে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখসহ সার্বভৌম ভূখণ্ডকে অবশ্যই তাদের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী চিত্রিত করার দাবি জানিয়েছে ভারত। এক্ষেত্রে কোনো ধরণের বিভ্রান্তিকর মানচিত্র গ্রহণযোগ্য হবে না বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে প্রচলিত মারকেটর মানচিত্র পুরোপুরি নিষিদ্ধ হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০১৮ সালের নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো পুরনো মানচিত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্কুলের ভূগোলের বই ও শিক্ষা উপকরণে নতুন মানচিত্র চালু করতে যাচ্ছে টোগো। এছাড়া, জিপিএস ও অন্যান্য অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তিতেও নতুন মানচিত্র সংযোজনের আহ্বান জানিয়েছে আফ্রিকা ইউনিয়ন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুরনো বিকৃত মানচিত্র ভারসাম্যহীন বিশ্বকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন একটি ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে ন্যায্য বিশ্ব ফুটে উঠবে।

জেআর