কিম জং উনের ‘প্রত্যাবর্তন’ কূটনীতি; বেইজিং সফরে নতুন সমীকরণ

শি জিনপিং ও কিম জং উন
শি জিনপিং ও কিম জং উন | ছবি: রয়টার্স
0

গত বছর বেইজিংয়ে এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনসহ অন্যান্য বিশ্ব নেতাদের আতিথেয়তা দিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেই ঘটনার পর থেকে দেশ দুটির মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন ও বিমান পরিষেবা পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহের এই শীর্ষ সম্মেলনটি ২০১৯ সালে শি জিনপিংয়ের প্রথম পিয়ং ইয়ং সফরের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের সেই সফরটি ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে কিমের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কয়েক মাস পর। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

শি জিনপিংয়ের এই সফরকে কিম জং উনের জন্য এক বড় ধরনের ‘প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে কিম রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছেন। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করতে তিনি সৈন্যও পাঠিয়েছেন। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একদিকে যেমন পরমাণু সক্ষমতা বাড়িয়ে চলছেন, অন্যদিকে পলায়ন ঠেকাতে উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত পুরোপুরি সিল করে দিয়েছেন কিম।

শি জিনপিংয়ের পৌঁছানোর ঠিক আগেই নিজের শক্তির জানান দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার ১০ হাজার টন ওজনের একটি নৌ-ডেস্ট্রয়ার তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর রোববার পুনরায় নিজেদের ‘পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটি। বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু গিলহম বলেন, ‘শি জিনপিংয়ের পিয়ং ইয়ং সফর একটি বড় ঘটনা। এটি কিমের গত কয়েক বছরের সফল প্রত্যাবর্তনেরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।’

২০১৯ সালে শি জিনপিংকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন কিম। হাজার হাজার মানুষের প্লাকার্ডে ফুটে উঠেছিল শি-র প্রতিকৃতি ও চীনের পতাকা। তবে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মাঝেমধ্যেই টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বেইজিং প্রকাশ্যে পিয়ং ইয়ংয়ের পরমাণু পরীক্ষার বিরোধিতা করে এসেছে। কিম নিজেও চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে চান না, তাই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে ভারসাম্য রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি। এশিয়া সোসাইটির সিনিয়র ফেলো জন ডেলুরি বলেন, ‘রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দিয়ে উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এটি কিমকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।’

আঞ্চলিক কূটনীতিকদের ধারণা, এই বৈঠকের মূল ফলাফল হতে পারে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। উত্তর কোরিয়া বর্তমানে একটি পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার মধ্যে পর্যটন শিল্পের প্রসার ও আবাসন নির্মাণ অন্যতম। ২০২০ সালে কঠোর করোনা বিধিনিষেধের কারণে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ায় দেশটি বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস হারিয়েছিল। মহামারির আগে উত্তর কোরিয়ার পর্যটন খাতের ৯০ শতাংশই ছিল চীনা পর্যটক।

সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মাসে উত্তর কোরিয়া সফর শেষে জানিয়েছেন, দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বেশ উন্নতি করেছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কিমের খুব একটা আগ্রহ নেই। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে দুই কোরিয়ার পুনরেকত্রীকরণ যে লক্ষ্য ছিল, কিম এখন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুং আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী এবং তিনি এ ক্ষেত্রে শি জিনপিংয়ের মধ্যস্থতা কামনা করেছেন।

তবে পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে কিম স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা টেনে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি দেশের পারমাণবিক অস্ত্রাগার ‘দ্রুতগতিতে’ বাড়ানোর আহ্বান জানান। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার গ্রিন বলেন, ‘কিম এখন অনেক বেশি সাহসী। তিনি জানেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি অঞ্চলে সরাসরি অস্থিরতা তৈরি না করছেন, ততক্ষণ বেইজিং তাকে থামানোর চেষ্টা করবে না।’

এএম