জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকট: প্রায় দুইশো বছরের ঐতিহ্য হারিয়ে অচল ঢাকা কলেজ

ঢাকা কলেজ | ছবি: এখন টিভি
0

আবেদন হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ। ভবন সংকট, ল্যাবে পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব, লাইব্রেরিতে বই সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রায় দুইশো বছরের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। ফলে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে প্রতিযোগিতায়। শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘ অবহেলা-অযত্নে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের পড়াশোনা। তবে সুষ্ঠু উন্নয়ন পরিকল্পনায় ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারে কলেজটি।

'নো দাইসেলফ- নিজেকে জানো' গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের এই মূলমন্ত্রে চলা ঢাকা কলেজ- যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে। ১৮৪ বছরে অসংখ্য মেধা তৈরি করলেও এখন বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ। বাইরে থেকে সুরম্য ফটক দেখা গেলেও ভেতরে অযত্ন আর জরাজীর্ণের ছাপ সর্বত্র।

কলেজে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী। ১৯টি বিভাগের মধ্যে প্রতিটিরই শ্রেণিকক্ষ সংকট। সপ্তাহে ক্লাস হয় মাত্র দুদিন। এমন পরিস্থিতিতে মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের যেতে বলা নতুন ভবনের ১০ তলায়।

শিক্ষার্থীরা জানান, ল্যাব রুমে আর হচ্ছে সেমিনারে মাঝে মাঝে ক্লাস হয়। ক্লাসরুম সংকটের কারণে মোটামুটি মানে আমাদের যে সিলেবাসটা থাকে সেটা শেষ হয় না।

প্রতিবর্ষে বিভাগগুলোতে যোগ হয় ১৩০ শিক্ষার্থী, তবে কিছু ক্লাসরুমে ধারণক্ষমতা ৩০-৪০ এর বেশি নয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাস করেন দাঁড়িয়ে। ক্লাসরুম সংকট এতটায় তীব্র যে, ভবনের বারান্দায়ও বেঞ্চ পেতে চলে ক্লাস।

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, যেখানে হাঁটাচলার স্থান, সেখানে বসে আমরা ক্লাস করছি। অন্য ব্যাচের যে ক্লাসমেটরা আছে, ওরা এসে এখানে অপেক্ষা করে একটি ক্লাস শেষ হওয়ার পরে তারা ক্লাস করবে এরকম।

এমনকি কলেজের পুরনো মূল ভবনে রয়েছে বেশ কয়েকটি গ্যালারি, যার অবস্থাও খুবই জরাজীর্ণ। রয়েছে অপরিষ্কার টয়লেট, ভাঙা বেসিন, অপ্রতুল পানির ব্যবস্থা। সবমিলিয়ে যা ব্যবহার অনুপযোগী। সেমিনারে বই নেই, ল্যাবে পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব। অধিকাংশ কম্পিউটারই নষ্ট। শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ে গঠিত হলেও নেতৃত্ব শূন্যতায় ব্যবহার হয় না ছাত্র সংসদ কার্যালয়ও।

এদিকে, কলেজের সামনের বিশাল সীমানা প্রাচীরটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে হেলে আছে। নিচ থেকে সরে গেছে মাটিও.। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

আরও পড়ুন:

দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এই প্রতিষ্ঠান। ফলে তাদের ঢাকায় থাকার একমাত্র ভরসা আবাসিক হল। যদিও শিক্ষার্থীর অনুপাতে নেই পর্যাপ্ত সিট।

জানালেন, ভূমিকম্পের সময় তাদের অভিজ্ঞতা। মেয়াদোত্তীর্ণ ভবনে থাকা থাকা এসব শিক্ষার্থীর দাবি, হল সংস্কার নয়। বরং, তারা চায় নতুন আবাসিক ভবন।

মোট ৮টি আবাসিক হলের মধ্যে নর্থ-সাউথ-ওয়েস্ট-ইন্টারন্যাশনাল বেশি পুরনো। এরমধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস হল। অনেকবারই হলটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দোতলায় ওঠার পথ বন্ধ রেখে নিচতলায় ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘ভূমিকম্প হলে কি পরিমাণ আতঙ্ক নিয়ে যে দৌড়ে বের হই এটা আসলে যখন হয় তখন বোঝা যায়। নতুন হল সংস্কারের তুলনায় নতুন হল হওয়াটা সবথেকে বেশি প্রয়োজন।’

অনেকটা অচল অবস্থায় অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমও। এনিয়ে অসহায় স্বীকারোক্তি ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষের। শুধু সংস্কার নয়- পুনর্গঠনে প্রয়োজন অন্তত ২০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের।

ঢাকা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আনোয়ার মাহমুদ বলেন, ‘ছাত্রদের আবাসন সমস্যা প্রকট। আবার আমরা জানি যে একটা ছাত্রাবাস বন্ধ হয়ে গেছে। ওখানে ১০ তলা একটা ভবন আমরা চেয়েছি। এই কলেজটাকে আসলে উন্নয়নের জন্য যদি ২০০ বা ৫০০ কোটি টাকার একটা ইয়ে রাখে, মানে প্রকল্প নেয়, তাহলে কিন্তু হয়ে যায়।’

অধ্যক্ষ জানালেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে নতুন ভবন নির্মাণে পরিকল্পনা করা হলেও প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রে গাথা।

অধ্যক্ষ অধ্যাপক একে এম ইলিয়াস বলেন, ‘সরকার প্রস্তাবনা নিয়েছিল, কিন্তু আসলে ওটার কোনো কাগজপত্র ছিল না। এখন সেইটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে থেকে অনুমোদিত হলেই এটা ইয়েতে যাবে, প্ল্যানিংয়ে। তা প্ল্যানিংয়ে গেলে তারা একটা পাস করে এই ইমপ্লিমেন্টেশনের জন্য আবার শিক্ষাকে পাঠাবে। সেটা হলো শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এই কাজটা করে। তা এটা এখনো আমি মনে করি যে বেশ যথেষ্ট সময় লাগবে।’

এবিষয় শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নগরবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘হঠাৎ করে চাইলেই তো সবগুলো রিপ্লেস করাও কঠিন। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যে বসবাস কন্টিনিউ করা—এটা তো আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্যই এগুলোকে নিয়ে সরকারের তড়িৎ একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত যে, কোনটা আমরা রাখবো, কোনটা রেট্রোফিট করব এবং কোনটা আমরা পুনরায় ভেঙে নতুন করে তৈরি করবো।’

ইএ