চার শতকের ঢাকা: নগরায়নের চাপে হারাচ্ছে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র

ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং | ছবি: এখন টিভি
0

ঢাকার বয়সকে চার শতকে বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। গবেষকরা তাদের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বয়সটাকে আড়াই সহস্রে নিয়ে বেঁধে রাখতে চাইছেন। বুড়িগঙ্গা দিয়ে এই সময়কালে যতো জল বয়ে গেছে, ঢাকার বিস্তারও হয়তো সেই তালে গড়িয়েছে চৌদিকে। সেই সাথে বদলেছে এই শহরের আড্ডা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার মানচিত্রও। একসময়ের নিঝুম গলি কিংবা উঠোনের আড্ডা আজ রূপ নিয়েছে ক্যাফে কালচার আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। নগর বিস্তৃতির আড়ালে স্মৃতির প্রদীপ আর মানবিক উষ্ণতা যখন ম্লান, তখনই শেকড়কে স্মরণের তাগিদ বিশিষ্টজনদের।

মানুষের চেয়ে শহরের স্মৃতি বড়। একটা শহরের নিজস্ব স্মৃতি থাকে। বারান্দার খাঁজে, পুরান গলির দেয়ালে, কবিতার ছন্দে কিংবা আন্দোলনের উত্তাল স্লোগানে বেঁচে থাকে সেই ইতিহাস। চার শতকের রূপ-রূপান্তর বুকে ধারণ করে আজকের এই মহানগরী।

মিষ্টি ষোলোর সেই গঙ্গাবুড়ির তীরে জন্ম নেয়া মোঘল জাহাঙ্গীরনগর থেকেই এর শুরু। এরপর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তার ঘটিয়ে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী পেরিয়ে ক্রমশ বড় হয়েছে এই শহর। দীর্ঘ বিস্তৃতির এই ঝলমলে আয়োজনে অনেকটাই ঢাকা পড়েছে প্রজন্মের চিরচেনা ঐতিহ্য।

ঢাকার আসল শেকড় পুরান ঢাকায়। শাঁখারীবাজার, বাংলাবাজার, সূত্রাপুর, ওয়ারী আর গেন্ডারিয়ার অলিগলিই ছিল সাংস্কৃতিক চর্চার আতুরঘর। সেখানকার সাহিত্য ও আড্ডা থেকেই উঠে এসেছেন বহু খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী।

স্বাধীনতার আগে থেকেই প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারার নীরব সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং। গুণী মানুষদের পদচারণায় নিয়মিত মুখর থাকত যার প্রাঙ্গণ।

তবে নগর প্রসারের সাথে সাথে বদলেছে কেন্দ্রস্থলও। এখন শাহবাগ, শিল্পকলা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সাংস্কৃতিক রাজধানী।

বিউটি বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থাপক বিজয় পোদ্দার বলেন, ‘আমরা তো আমাদের জায়গায় আছি। কোনকিছু পরিবর্তন আমরা করি নাই। আমরা পুরাতনকে আঁকড়ে আছি। এখন ওই ওনাদের শাহবাগকেন্দ্রিক আর বাংলা মোটরকেন্দ্রিক হওয়ার ওনাদের মনের কিছু পরিবর্তন হয়েছে। নাহলে আমরা তো একই জায়গায় আছি।’

আরও পড়ুন:

একসময় কচিকাঁচার মেলার মতো সংগঠনগুলো শিশু-কিশোরদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে ছিল অন্যতম ভরসা। গল্প বলা, আবৃত্তি, গান ও নাটকের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতো নতুন প্রজন্মেত ভিত। তবে আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে সেই অংশগ্রহণমূলক চর্চা স্থবির হয়ে পড়া নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা।

সাংস্কৃতিক সংগঠক সাইফুর রহমান দুলু বলেন, ‘ইস্টার্ন ক্লাবে নিয়মিত নাটক হতো এবং সেই নাটকে এবং এই দেশের শীর্ষস্থানীয় নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকর্মীরা অভিনয় করতো, পরিচালনা করতো। এইগুলো আমরা দেখেই বড় হয়েছি। সাংস্কৃতিক রুচিরও পরিবর্তন হইছে। রুচির সাথে সাথে জায়গারও পরিবর্তন হইছে, ব্যাপক হইছে, ব্যাপ্তিটা অনেক বেড়েছে।’

কয়েক লাখ মানুষের শহর থেকে আজ কোটিরও বেশি মানুষের মেগাসিটিতে রূপ নেয়ার গল্প এটি।অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার চাপে হারিয়ে গেছে খোলা মাঠ, সংকুচিত হয়েছে মুক্ত আকাশ; আর এরই ধাক্কায় বদলে গেছে নগরবাসীর জীবনযাপনের স্বাভাবিক ছন্দ।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের নাগরিকরা যেভাবে সাফার করছে, যেভাবে রাস্তাঘাটে চলাফেরা আমাদের করতে হচ্ছে, যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে সময় অপচয় হয়ে যাচ্ছে, বসে থাকতে হচ্ছে—মানুষ ঠিকমতো তার কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছে না, ঠিকমতো বাড়িতে পৌঁছাতে পারছে না। আমার মনে হয় সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা একটা শ্বাসরুদ্ধকর শহর হয়ে উঠেছে। এখানে শ্বাস ফেলা যায় না ঠিকমতো, এখানে আকাশ দেখা যায় না ঠিকমতো। কিন্তু সংস্কৃতি চর্চার জন্য, শিল্প চর্চার জন্য মুক্ত জায়গার খুব বেশি দরকার।’

নগরায়ণে বাদ সাধার সাধ্য কার! তবে কংক্রিটের এই বিস্তৃতির মাঝেও মানুষের প্রয়োজন কিছুটা মুক্ত হাওয়া আর সাংস্কৃতিক আশ্রয়। ইট-পাথরের বাইরেও শহুরে জীবনের প্রাণ টিকে থাক আড্ডা, শিল্পচর্চা আর মানুষের আত্মিক মেলবন্ধনে।

ইএ