যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি: ইরানের ভেতরে মতপার্থক্য কোথায়?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

তেহরানের রাস্তায় সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ব্যানার
তেহরানের রাস্তায় সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ব্যানার | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি ইরান। তবে তেহরানের ভেতরে ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে অবস্থান এক নয়। সামরিক ও কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো কঠোর অবস্থান ধরে রাখলেও সরকারের কিছু অংশ বাস্তববাদী সমঝোতার পক্ষে ঝুঁকছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং ইরানি বন্দর অবরোধের প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো ঐকমত্য হয়নি। একইভাবে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

মুজতবা খামেনি

নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনি এখন ধর্মতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামোর শীর্ষে রয়েছেন। তিনি সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা না করলেও বারবার বলেছেন, পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ ‘যুক্তরাষ্ট্রবিহীন’ হবে। পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তিনি ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হবে ধরে নিয়ে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

সামরিক ও আইআরজিসি শিবির

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ জেনারেলরা বড় ধরনের ছাড়ের বিপক্ষে। আইআরজিসি প্রধান আহমদ ভাহিদি সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ‘ধ্বংসাত্মক জবাব’ দেয়া হবে। সামরিক নেতৃত্ব হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করেছে। সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলী জাফারি পাঁচটি শর্তের কথা বলেছেন সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ মুক্তি, ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজে ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি।

কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবির

সাঈদ জালিলির নেতৃত্বাধীন ‘পায়দারি ফ্রন্ট’ আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জালিলি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্ভব নয় এবং নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ ‘নিরস্ত’ করতে হবে। সংসদের অনেক অতিরক্ষণশীল সদস্যও একই অবস্থানে রয়েছেন।

সরকারের বাস্তববাদী অংশ

অন্যদিকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুদ্ধ বন্ধ ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে আলোচনাকে সমর্থন করেছেন। তারা ‘আত্মসমর্পণ নয়, তবে বাস্তববাদী সমঝোতা’—এই অবস্থান তুলে ধরছেন।

ইরানি গণমাধ্যমের ভূমিকা

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলোতে কঠোর অবস্থানই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ, জাহাজ চলাচলে ফি আরোপ এবং বিদেশে জব্দ থাকা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ফেরত পাওয়াকে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী চুক্তির শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বোপরি, ইরানের ভেতরে ‘আত্মসমর্পণ নয়’—এমন ঐক্যবদ্ধ বার্তা থাকলেও আলোচনার ধরন ও ছাড়ের মাত্রা নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রেখে সীমিত সমঝোতায় যাওয়া নাকি কঠোর অবস্থানে থাকা—এই দ্বিধার মধ্যেই এগোচ্ছে তেহরান।

এএম