গতকাল (রোববার, ৩১ মে) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের রাডার ও কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় উড়তে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনায় ‘আগ্রাসী পদক্ষেপের’ জবাব হিসেবে এই হামলা চালানো হয়। সেন্টকম জানায়, মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা দুটি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ইরানের সিরিক দ্বীপের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালাতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে তারা আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে। তবে কোন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে কুয়েত জানিয়েছিল, তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই দেশ একাধিকবার পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। গত সপ্তাহেও কুয়েত জানিয়েছিল, তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। এসব ঘটনায় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
সংঘাত বন্ধে চলমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক। এর মাধ্যমে শত্রুতা বন্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়ে পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি তৈরির কথা রয়েছে।
শুক্রবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প চুক্তিতে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন, ফলে আলোচনা আরও এক সপ্তাহ গড়িয়েছে। সর্বশেষ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায়, এবং এটি যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের সঙ্গে থাকা সবার জন্য ভালো হবে।’
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক অঙ্গীকার ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে চুক্তির ভাষা আরও কঠোর করার ওপর জোর দিয়েছেন ট্রাম্প। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক বিদেশি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘পরিবর্তনগুলো মৌলিক নয়; বরং এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়ার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
আরও পড়ুন:
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রোববার তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে বলেন, ‘তেহরানের ‘‘অধিকার’’ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি অনুমোদন করা হবে না। তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক ময়দানের যোদ্ধাদের শত্রুর কথায় ও প্রতিশ্রুতিতে কোনো আস্থা নেই। আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো দৃশ্যমান অর্জন, যার বিনিময়ে আমরা আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করবো।’
এদিকে ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস বলেন, কাগজে-কলমে চুক্তির শর্ত গ্রহণযোগ্য মনে হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দিয়ে ইরানের বড় কারখানায় হামলা চালাতে পারি, কিন্তু তারা খনি পেতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা বা ড্রোন দিয়ে আমাদের ও মিত্রদের ওপর হামলার ক্ষমতা পুরোপুরি ঠেকাতে পারবো না। এই সক্ষমতা মোকাবিলায় কঠোর চুক্তি প্রয়োজন।’
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ এবং প্রণালি থেকে ইরানি মাইন অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আলোচনার মধ্যেও অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। সেন্টকম জানায়, শুক্রবার ইরানের দিকে যাওয়া গাম্বিয়া পতাকাবাহী একটি জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেটিকে অচল করা হয়েছে। অবরোধ শুরুর পর এটি পঞ্চম বাণিজ্যিক জাহাজ, যেটি অচল করা হলো। এছাড়া শতাধিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট রোববার বলেন, ফেডারেল সরকার ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ তেলের মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের ওপর প্রেসিডেন্টের শর্ত মেনে নেয়ার জন্য যথেষ্ট চাপ রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে আরও ৯১ লাখ ব্যারেল তেল কমেছে। চুক্তি হলে এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে বলে জানান হ্যাসেট।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৪ দশমিক ৩৪ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। গ্যালাপের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অর্থনীতিকে ভালো বা চমৎকার হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।





