কিউবার ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প; লক্ষ্য কী ওয়াশিংটনের

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগ্রহীত
0

যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও অবনতির দিকে গেছে। কিউবাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে তেল অবরোধ, নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে, কিউবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে হাভানার অভিযোগ, সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরির জন্য ‘ভুয়া মামলা’ ব্যবহার করছে ওয়াশিংটন। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই কিউবার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্চে তিনি কিউবাকে ‘গভীর সংকটে থাকা’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ দখল’ নেয়ার হুমকিও দেন।

এখন পর্যন্ত সামরিক অভিযানের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও কিউবায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন নজরদারি তৎপরতা বেড়েছে। গত সপ্তাহে কিউবার আশপাশে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের অবস্থান উন্মুক্ত ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটে দেখা গেছে।

ব্রিটিশ ড্রোন বিশেষজ্ঞ স্টিভ রাইট বলেন, ‘উড়োজাহাজগুলোর অবস্থান প্রকাশ্যে দেখানোর সিদ্ধান্ত সম্ভবত ইচ্ছাকৃত। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।’

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কিউবার কাছে ৩০০ ড্রোন রয়েছে এবং দেশটি গুয়ান্তানামো বে, ফ্লোরিডার কি-ওয়েস্ট ও মার্কিন নৌযান লক্ষ্য করে হামলার আলোচনা করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাভানায় ইরানি সামরিক উপদেষ্টারাও অবস্থান করছেন।

তবে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এসব দাবি নাকচ করে বলেন, ‘কিউবা যুদ্ধ চায় না এবং কারও জন্য হুমকিও নয়। তার অভিযোগ, সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরিতে ‘‘ভুয়া মামলা’’ দাঁড় করাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।’

আরও পড়ুন:

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘হোয়াইট হাউস কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও কিউবাকে তিনি ‘‘জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি’’ হিসেবে দেখছেন।’ তার ভাষায়, শান্তিপূর্ণ সমঝোতার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

কিউবার ক্ষমতার কেন্দ্র এখনও কাস্ত্রো পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো প্রায় ৯৫ বছর বয়সেও ‘কিউবান বিপ্লবের নেতা’ উপাধি বহন করছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে থাকলেও কাস্ত্রো পরিবারের প্রভাব এখনও দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় শক্তিশালী।

সম্প্রতি ১৯৯৬ সালের একটি ঘটনার জেরে রাউল কাস্ত্রোসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় কিউবার যুদ্ধবিমান মিয়ামিভিত্তিক নির্বাসিত কিউবান গোষ্ঠীর দুটি বেসামরিক উড়োজাহাজ ভূপাতিত করে। এতে তিন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হন।

ওয়াশিংটনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক উড়োজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। তবে কিউবার দাবি, ঘটনাটি তাদের আকাশসীমায় ঘটেছিল এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওই উড়োজাহাজ ভূপাতিত করা হয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবায় জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্য ও ওষুধের সংকটে দেশটিতে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। হাসপাতাল, স্কুল ও সরকারি অফিসগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

রাজধানী হাভানাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে। বুধবার একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কিউবার জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন ১০ কোটি ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সেটি কিউবা সরকারকে পাশ কাটিয়ে ক্যাথলিক চার্চ ও স্বাধীন মানবিক সংস্থার মাধ্যমে বিতরণের শর্ত দেয়। কিউবার দাবি, সদিচ্ছা থেকে দেয়া সহায়তা তারা প্রত্যাখ্যান করে না। তবে সবচেয়ে বড় সহায়তা হবে অবরোধ তুলে নেয়া।

চীন ও রাশিয়াও কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সমালোচনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জবরদস্তি’ ও ‘হুমকি’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ক্রেমলিন বলেছে, হাভানার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা ‘সহিংসতার কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছে।

এএম