উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে ইরানে নতুন হামলা স্থগিত: ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগ্রহীত
0

উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে ইরানে পরিকল্পিত একটি সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আজ (মঙ্গলবার, ১৯ মে) এই হামলার পরিকল্পনা ছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘এখনো আলোচনা চলছে’ বলেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাকে জানানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য’ একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না!’ তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে ইরানে পূর্ণাঙ্গ ও বড় পরিসরে হামলা চালাতে প্রস্তুত থাকবে।’ অন্যদিকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পুনরায় কৌশলগত ভুল ও হিসাব-নিকাশে ভুল’ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে তার জনপ্রিয়তার হার কমছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যায়, নিজ দেশে (যুক্তরাষ্ট্র) এই যুদ্ধ ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গত সোমবার প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা জরিপ অনুযায়ী, ৬৪ শতাংশ ভোটার মনে করেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।

জরিপে আরও দেখা যায়, মাত্র ৩৭ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের কার্যক্রমকে সমর্থন করেন। যুদ্ধ, অর্থনীতি ও অভিবাসন ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের বাড়তে থাকা ক্ষোভের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে, এই জরিপ তারই ইঙ্গিত দেয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে তেহরানও ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অন্যতম বড় ভয়ের জায়গা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো হামলার পর ইরান কীভাবে তার প্রতিশোধ নেবে।

প্রতিবেশী দেশগুলো, তাদের বিমানবন্দর, পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মের তীব্র গরমে পানীয় জল সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় (ডেসালিনেশন প্লান্ট) পূর্ণাঙ্গ হামলা চালানোর জন্য ইরানের কাছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত আছে বলে জানা যায়।

আরও পড়ুন:

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প একে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তবে এর থেকে শেষ পর্যন্ত কিছু হয় কি না, তা আমাদের দেখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আগেও এমন কিছু সময় এসেছে, যখন আমরা ভেবেছিলাম চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, কিন্তু তা হয়নি। তবে এবারের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।’ ইরানের সঙ্গে চুক্তির ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যদি তাদের ওপর ধ্বংসাত্মক বোমা হামলা না চালিয়েই সেটি করতে পারি, তবে আমি খুব খুশি হবো।’

আলোচনা সহজ করতে গত এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি কিছু বিচ্ছিন্ন গোলাগুলি ছাড়া অনেকটাই কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে ইরান এখনো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস চলাচলের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি প্রায় বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এদিকে তেহরানকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত সোমবার গভীর রাতে ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির একটি মন্তব্য প্রকাশ করে। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এমন সব নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলা হবে, যেখানে শত্রুদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এবং তারা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’ তাসনিম মূলত গত ১২ মার্চ দেয়া খামেনির একটি বক্তব্য পুনরায় প্রকাশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি তার আগের লিখিত বার্তাগুলো নতুন করে প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

এর আগে সোমবার ইরান জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সবশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে কোনো সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

আরও পড়ুন:

গত রোববার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে, তাদের দ্রুত এগোতে হবে, তা না হলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ কয়েক দিন আগে তেহরানের দাবিগুলোকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেন, তাদের অবস্থান ‘দায়িত্বশীল’ ও ‘উদার’।

তাসনিম নিউজ এজেন্সির মতে, ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা (অর্থাৎ লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর চলমান ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা), ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানে আর কোনো হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিতেও জোর দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম ফারস গত রোববার জানায়, তেহরানের প্রস্তাবের জবাবে ওয়াশিংটন পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো—ইরানকে কেবল একটি পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখতে হবে এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে হবে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি (যা দুই দেশের মধ্যে প্রধান বিরোধের বিষয়) ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখলে তিনি তা মেনে নেবেন। এটি পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার আগের দাবি থেকে মার্কিন অবস্থানের পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের দাবি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইরান। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত।

এএম