গত মাসে পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি নতুন আদেশের (এসআরও ৬৯১) মাধ্যমে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি ট্রানজিট রুট নির্ধারণ করে দেয়। প্রায় দুই দশক ধরে স্থগিত থাকা এই প্রকল্পের আওতায় পাকিস্তানের করাচি, পোর্ট কাসিম ও গদর বন্দর থেকে বেলুচিস্তান হয়ে ইরানের গাবদ ও তাফতান সীমান্ত পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা যাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট রুট গদর থেকে গাবদ পর্যন্ত পৌঁছাতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে, যেখানে করাচি থেকে সময় লাগে প্রায় ১৮ ঘণ্টা।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিতীয় দফা আলোচনা ভেস্তে গেছে এবং ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে সামুদ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে যুদ্ধকালীন বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো ইরানে পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেয়। ফলে করাচি বন্দরে ইরানের হাজার হাজার কনটেইনার আটকা পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ফাতেমা আমান মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এই করিডোরের মাধ্যমে ইরান বেশ উপকৃত হতে পারে। সামুদ্রিক রুটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা সীমিত আকারে আঞ্চলিক বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারবে।’
২০০৮ সালে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সড়ক পরিবহন চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তা এতদিন স্থগিত ছিল। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের মতে, ইরানের নিজেদের চাবাহার বন্দরের চেয়ে পাকিস্তানের গদর বন্দর শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তেহরান চুক্তিটি নিয়ে এগোয়নি। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ ও অবরোধের পর সেই হিসাব পাল্টে গেছে। চাবাহার বন্দরও সংঘাতের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে ইরান পুনরায় পাকিস্তানের স্থলপথ চালুর পক্ষে সম্মতি দেয়।
গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের পর ইরানি বন্দরগামী জাহাজগুলো বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। কিন্তু চীন বা অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য যদি পাকিস্তানের বন্দরে খালাস হয় এবং সেখান থেকে ট্রাকে করে ইরানে পৌঁছায়, তবে তা মার্কিন নৌবাহিনীর আওতার বাইরে থেকে যায়।
ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই করিডোরের বিরোধিতা করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শুধু বলেছেন, ‘আমি সবকিছুই জানি।’
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মোস্তফা মোদাব্বের বলেন, ‘পাকিস্তানের এই রুট ইরানের অর্থনীতিকে হয়তো পুরোপুরি বদলে দেবে না, কিন্তু এটি তাদের পরোক্ষভাবে আঞ্চলিক বাজার ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তবে পাকিস্তানের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমান্তে নিরাপত্তাহীনতা ও চোরাচালানের কারণে রুটটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।’
অন্যদিকে পাকিস্তান এই রুট দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেখছে। এটি চীনের সাহায্যপুষ্ট গদর বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়াবে। তবে এতে পাকিস্তানের জন্য কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে। ইরানে পণ্য পরিবহনে জড়িত পাকিস্তানের ব্যাংক বা লজিস্টিক কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।





