মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার মুখে ইরানের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি অংশ নেয়নি। তারা তখন বলেছিল, তাদের হাত ‘ট্রিগারে’ আছে। গতকাল (শনিবার, ২৮ মার্চ) তারা জানায়, ইসরাইলি সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরাইল বলেছে, তারা ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করেছে এবং তা প্রতিহত করতে কাজ করছে।
আল-মুস্লিমি এএফপিকে বলেন, ‘হুথিদের সম্পৃক্ততা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রভাবসহ একটি অস্থির যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সাল থেকে রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা হুথিরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্ত হবে—এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। আল-মুস্লিমি বলেন, ‘হুথিরা সম্ভবত এই যুদ্ধের বাইরে থাকার চেষ্টা করেছিল, কারণ এতে তাদের কোনোভাবেই লাভ হবে না।’ তবে বহু বছর ধরে সমর্থন দেয়া ইরানের প্রতি ঋণ শোধ করতেই তাদের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নামতে হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রথম আঘাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বদলে ইসরাইলকে লক্ষ্য করেছে—গাজা যুদ্ধের সময়ও তারা প্রায়ই এমন করেছিল।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্ট এক্সে লিখেছে, এতে সমর্থকদের কাছে এবং মিত্রদের উদ্দেশে বার্তা যায় যে হুথিদের মূল মনোযোগ এখনো ফিলিস্তিনি ইস্যুতে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে ইঙ্গিত দিচ্ছে—অন্তত আপাতত তাদের লক্ষ্য করছে না। বাশা রিপোর্টের মতে, পরবর্তী ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে হামলার চেয়ে আঞ্চলিক সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক চলাচলে হামলার সম্ভাবনা বেশি; এতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ডেকে আনার মতো ‘রেখা’ না পেরিয়ে চাপ তৈরি হয়।
লোহিত সাগরের ওপর পাহাড়ি ঘাঁটি থেকে হুথিরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাহাজ চলাচল বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। গাজা যুদ্ধের সময় তারা ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা জাহাজ লক্ষ্য করেছিল। এতে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের সরু জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচল নিরুৎসাহিত হয়; এই প্রণালিই ভারত মহাসাগর থেকে সুয়েজ খালে যাওয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগে লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ; বাব আল-মানদেব বিশ্বের ব্যস্ততম নৌপথগুলোর একটি। আরব উপদ্বীপের অপর পাশে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল প্রবাহের ক্ষেত্রে এই চোকপয়েন্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিকল্প পথ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়। বাব আল-মানদেবও ঝুঁকিতে পড়লে ভঙ্গুর বৈশ্বিক বাজার আরও অস্থির হতে পারে বলে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়।
আরও পড়ুন:
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের তেল ট্যাংকারগুলোকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে এই পথটিই দেশটির শেষ নিরাপদ তেল রপ্তানি-দ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেটিও বাধাগ্রস্ত হলে রিয়াদ ইরানের প্রায় দৈনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করলেও পাল্টা জবাব না দেয়ার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সৌদি নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিশাম আলঘান্নাম এএফপিকে বলেন, ‘যুদ্ধ নিয়ে সৌদি আরবের সতর্ক নিরপেক্ষতা ভেঙে পড়তে পারে এবং রিয়াদ সীমিত হলেও প্রতিশোধের কথা ভাবতে পারে।’
হুথিরা তাদের বিবৃতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও আঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে এএফপি জানিয়েছে। আল-মুস্লিমি বলেন, ‘উপসাগরজুড়ে সৌদি অবকাঠামো ও পশ্চিমা ঘাঁটিতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের তুলনায় হুথিরা আরও কাছাকাছি এবং সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।’এতে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। হুথিরা ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুদ্ধে ছিল; পরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ইয়েমেন আবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আগের সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক পরিণতি ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে বলেও এএফপি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।





