বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় সমুদ্রপথে। আর মজার ব্যাপার হলো এই বিশাল বাণিজ্যের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করে কয়েকটি সরু প্রণালি আর খালের ওপর।
অর্থাৎ এগুলো শুধু জলপথ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘চোকপয়েন্ট’ বা সংকটকেন্দ্র। যার নিয়ন্ত্রণ মানেই অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব খাটানো।
সুয়েজ খাল
প্রথমেই আসা যাক মিশরের সুয়েজ খালে। ইউরোপ আর এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম সংযোগ এটি। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যায়। আর প্রতিটি বড় জাহাজকে দিতে হয় তিন লাখ থেকে দশ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল। ফলে ২০২৩ সালেই এই খাল থেকে মিশরের আয় হয় প্রায় ৯.৪ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন:
পানামা খাল
এবার চোখ ফেরাই আমেরিকা মহাদেশে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝামাঝি পানামা খালও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে বছরে প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ চলাচল করে। যেখান থেকে আয় চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। জাহাজের আকার অনুযায়ী টোল এক থেকে দশ লাখ ডলার পর্যন্ত।
মালাক্কা প্রণালি
অন্যদিকে, ভারত মহাসাগর আর প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে মালাক্কা প্রণালীকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত ‘মেরিন হাইওয়ে’। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। যদিও সরাসরি টোল নেই, তবে নিরাপত্তা, পাইলটেজ আর নেভিগেশন চার্জ ঠিকই দিতে হয়। প্রতি বছর ৯০ হাজারের বেশি জাহাজ চলাচল করে এই প্রণালী দিয়ে।
আরও পড়ুন:
হরমুজ প্রণালি
তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান করিডর এটি। বৈশ্বিক চাহিদার ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হলেও কোনো টোলই দিতে হয় না।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় হরমুজ আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরান বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। সংঘাত বাড়লে এই পথ বন্ধ বা সীমিত করে দিতে পারে। আর বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি টোল না থাকলেও সামরিক নিয়ন্ত্রণ আর হুমকির মাধ্যমেই তৈরি হতে পারে এক ধরনের ‘অঘোষিত টোল’।
আরও পড়ুন:
এখন প্রশ্ন হলো এর প্রভাব কতটা? উত্তরটা সহজ— বিশাল হরমুজে সামান্য বিঘ্ন মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়া। আর তেলের দাম বাড়লে তার ঢেউ লাগে পরিবহন, উৎপাদন এমনকি নিত্যপণ্যের বাজারেও।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বিষয়টা আরও স্পর্শকাতর। জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে আর শেষ পর্যন্ত বাড়ে মূল্যস্ফীতি।
সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার, বিশ্বের কোথাও টোল দিয়ে আয় নিশ্চিত করা হয়, আবার কোথাও পথের নিয়ন্ত্রণই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি। অর্থাৎ, সমুদ্রপথের এই সরু গলিপথগুলোই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালক আর কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও।





