যুদ্ধ শেষ হলেও স্বস্তিতে নেই ইরান, ঘনিয়ে আসছে চরম অর্থনৈতিক সংকট

দক্ষিণ তেহরানে হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে এক সরকার সমর্থক
দক্ষিণ তেহরানে হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে এক সরকার সমর্থক | ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
0

যুদ্ধকালীন ঐক্যের দিনগুলো শেষ হতে না হতেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান। তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশটি এখন শান্তিচুক্তি ও পুনর্গঠনের পথে হাঁটতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু সামনে রয়েছে আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, ১০ শতাংশ সংকুচিত অর্থনীতি আর নজিরবিহীন লোডশেডিং। যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরলেও ইরান এখন ‘শান্তি’র কঠিন পরীক্ষায় কীভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে খোদ দেশটির ভেতরেই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। দ্যা গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইরানের ‘আজাদ’সহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে এখন দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ অধিকতর উন্মুক্ত সমাজ গড়ার কথা বলছেন, আবার সমঝোতাকারী দলের ঘনিষ্ঠ সাঈদ আজোরলুর মতো কট্টরপন্থিরা বলছেন, ইরান যে দুর্বল নয় তা পশ্চিমাদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে, তাই এখন স্বনির্ভরতার মাধ্যমেই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তবে পুরো বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। তিনি কি আসলেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন নাকি জব্দ করা সব সম্পদ ফেরত দেবেন? ইরানি অর্থনীতিবিদদের মতে, অবকাঠামো, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে ইরানের যে ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় প্রাপ্তি হবে নগণ্য। কুর্দিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফুয়াদ হাবিবির মতে, জানুয়ারির রক্তাক্ত বিক্ষোভের কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত এবং যুদ্ধের ফলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নৌ-অবরোধ ও ইন্টারনেটের ওপর কড়াকড়ির কারণে অন্তত ২০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। জনরোষ প্রকাশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।’

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কতটা করুণ, তা বোঝা যায় খাদ্যের দামের দিকে তাকালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে খাদ্যের দাম এখন সর্বোচ্চ। মে মাসে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩০ শতাংশ এবং মাংস ও মুরগির ক্ষেত্রে তা ১৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে। পুষ্টিবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হওয়ায় শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ আজারি জাহরোমি তার টেলিগ্রামে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুর পরবর্তী বোমাটি হয়তো বারুদ নয়, বরং মূল্যস্ফীতি হতে পারে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা কি প্রস্তুত?’

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বারবার সামাজিক সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে জ্বালানি সংকট এতটাই তীব্র যে, প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে নাগরিকদের। এদিকে ইন্টারনেটের ওপর থেকে সেন্সরশিপ আংশিক তুলে নেয়া নিয়ে কট্টরপন্থিরা যোগাযোগমন্ত্রীর অভিশংসন দাবি করছেন। রাজনৈতিক কর্মী রহিম ঘোমেইশি লিখেছেন, ‘বিপজ্জনক ঢেউ আর রক্তপিপাসু হাঙরের হাত থেকে তো বাঁচলাম, কিন্তু এরপর কী? আমাদের তো পেটের ক্ষুধা মেটানোর চিন্তায় দিন পার করার কথা ছিল না।’

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ আলবার্ট বাগজিয়ান মনে করেন, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দুর্নীতি ও অদক্ষতা দূর না করলে ১২ বা ২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রাপ্তি কোনো বড় পরিবর্তন আনবে না। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, অর্থনীতির ওপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একচ্ছত্র আধিপত্যই এখন মূল সমস্যা।

রাজনৈতিক দমনপীড়নও থেমে নেই। জানুয়ারির বিক্ষোভের পর থেকে মৃত্যুদণ্ড ও ধরপাকড় বেড়েছে। সংস্কারপন্থি দলগুলো পেজেশকিয়ানকে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে মৃত্যুদণ্ড বন্ধের অনুরোধ করেছে, কারণ এটি যুদ্ধের সময় অর্জিত ইরানের ‘নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব’কে ক্ষুণ্ণ করছে। এরই মধ্যে ২০১১ সাল থেকে গৃহবন্দি থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মীর হোসেন মুসাভিকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিস্ময়করভাবে ট্রাম্প এবার ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তিনি হিজবুল্লাহর সঙ্গে ফোনালাপের কথা জানিয়েছেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রশংসা করে তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যদি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি না ওঠে এবং বিদেশি বিনিয়োগ না আসে, তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ ইরানের স্থায়ী নিয়তিতে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু অভাব আর অস্থিরতার নতুন এক লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে ইরানের প্রতিটি ঘরে।

এএম