Recent event

শবে বরাতের সঠিক আমল ও নিয়ম, যেভাবে কাটাবেন মুক্তির এই মহা রজনী

শবে বরাত ২০২৬: ভাগ্য রজনী নাকি ক্ষমার রাত?
শবে বরাত ২০২৬: ভাগ্য রজনী নাকি ক্ষমার রাত? | ছবি: এখন টিভি
4

ইসলামি সংস্কৃতিতে বরকতময় রজনীগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শবে বরাত (Shab-e-Barat)। ফারসি শব্দ ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ মানে মুক্তি; অর্থাৎ শবে বরাত অর্থ মুক্তির রজনী (Night of Salvation)। হাদিসের পরিভাষায় একে ‘নিসফে শাবান’ বা শাবান মাসের মধ্যরজনী বলা হয়। এই রাতের ইবাদত ও পরবর্তী দিনের রোজা নিয়ে সঠিক ইসলামি দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো:

একনজরে: শবে বরাতের নামাজ ও রোজার সারাংশ
বিষয় (Subject) সঠিক নিয়ম (Correct Rule)
নামাজ (Prayer) সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই; সাধারণ নফলের মতো ২ রাকাত করে পড়তে হয়।
রোজার সংখ্যা (Number of Fasts) আইয়ামে বীজের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ১ থেকে ৩টি রোজা রাখা উত্তম।
নামাজের সুরা যেকোনো সুরা দিয়ে পড়া যায়; নির্দিষ্ট সুরার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
মুখ্য উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা (Forgiveness) ও রহমত প্রার্থনা করা।

আরও পড়ুন:

শবে বরাতের নামাজের নিয়ম (Rules of Shab-e-Barat Prayer)

অনেকেই জানতে চান শবে বরাতের নামাজ (Shab-e-Barat Namaz) কত রাকাত বা কোন সুরা দিয়ে পড়তে হয়। মূলত, শবে বরাতের নামাজের সুনির্দিষ্ট কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। অন্যান্য নফল নামাজের মতোই দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়া যায়। বিভিন্ন বইয়ে নির্দিষ্ট সুরা বা নির্দিষ্ট সংখ্যার যেসব নিয়ম লেখা থাকে, ইসলামি শরিয়তে (Islamic Sharia) তার কোনো ভিত্তি নেই। তাই সাধারণ নফল নামাজের মতোই একাগ্রতার সাথে দীর্ঘ কেরাত ও সেজদায় নামাজ আদায় করা উত্তম।

শবে বরাতের রোজা কয়টি ও কী নিয়ম? (Fasting of Shab-e-Barat)

শবে বরাতের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান রোজা রাখা নিয়ে সমাজে প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখা সুন্নত (Sunnah fasting), যাকে ‘আইয়ামে বীজ’ (Ayyam-e-Beed) বলা হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও প্রতি মাসে এই তিন দিন রোজা রাখতেন।

যেহেতু ১৫ই শাবান আইয়ামে বীজের অন্তর্ভুক্ত, তাই এই নিয়তে রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এছাড়াও শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা নবীজির সুন্নাত। রোজার নিয়ম (Rules of Fasting) অন্যান্য সাধারণ ফরয বা নফল রোজার মতোই—সুবহে সাদিকের আগে সেহরি এবং সূর্যাস্তের সময় ইফতার করা।

শবে বরাতের সঠিক আমল: যেভাবে কাটাবেন মুক্তির এই মহা রজনী

আজ পবিত্র শবে বরাত (Shab-e-Barat)। ফারসি শব্দ ‘শব’ মানে রাত আর ‘বরাত’ মানে মুক্তি বা সৌভাগ্য। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের গুনাহ মাফ করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি (Salvation from Hell) দান করেন। এই বরকতময় রাতটি কীভাবে পালন করলে সর্বোত্তম সওয়াব হাসিল করা সম্ভব, তার একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বিনীতভাবে তওবা করা (Sincere Repentance): মানুষ হিসেবে আমরা সারা বছর অসংখ্য গুনাহ করে থাকি। এই রাতে আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা (Seeking Forgiveness) করা এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল।

২. নফল নামাজ ও দীর্ঘ সেজদা (Nafl Prayer): শবে বরাতের নামাজ (Shab-e-Barat Namaz) হিসেবে দুই রাকাত করে নফল নামাজ আদায় করা যায়। তবে নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা বা বিশেষ কোনো সুরা পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। খুশু-খুজুর সঙ্গে দীর্ঘ রুকু ও সেজদায় মহান আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করার চেষ্টা করুন।

৩. কোরআন তেলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন (Quran Recitation): কোরআন তেলাওয়াত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ঈমান মজবুত করে। অন্তত কিছু আয়াত হলেও অর্থসহ পাঠ করার চেষ্টা করুন, যা আপনার জীবনব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

৪. দান-সদকা ও পরোপকার (Charity and Sadaqah): দান-সদকা মুমিনের জীবন থেকে বালা-মুসিবত দূর করে। সুরা সাবার ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, "তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে তিনি তার বিনিময় দেবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।" তাই সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়দের সাহায্য করা এই রাতের অন্যতম উত্তম কাজ।

আরও পড়ুন:

৫. কান্নাকাটি করে দোয়া করা (Supplication/Dua): দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। নিজের জন্য, পরিবার, মৃত আত্মীয় এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর (Muslim Ummah) জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ চেয়ে দীর্ঘ দোয়া করুন।

৬. কবর জিয়ারত ও মাগফিরাত (Visiting Graves): রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই সুযোগ থাকলে কবর জিয়ারত করা অথবা ঘরে বসেই পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের রুহের মাগফিরাত (Praying for the deceased) কামনা করা উচিত।

৭. ১৫ই শাবানের নফল রোজা (Fasting on 15th Shaban): শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান নফল রোজা (Nafl Fasting) রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (সা.) প্রতি মাসের আইয়ামে বীজে রোজা রাখতেন, সেই হিসেবে এই রোজাটি সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

আরও পড়ুন:

বর্জনীয় কাজ (Practices to Avoid)

এই রাতের পবিত্রতা নষ্ট হয় এমন কাজ যেমন—আতশবাজি (Fireworks), ফানুস উড়ানো বা অনর্থক আড্ডা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যেকোনো ধরনের বিদআত (Bidah) বা ভিত্তিহীন প্রথা বর্জন করে খাঁটি ইবাদতে মগ্ন থাকাই মুমিনের পরিচয়।

শবে বরাতের আমল ও বর্জনীয় কাজ
অবশ্যই পালনীয় (Must Do) অবশ্যই বর্জনীয় (Must Avoid)
খাঁটি মনে তওবা ও এস্তিগফার আতশবাজি ও পটকা ফুটানো
নফল নামাজ ও দীর্ঘ দোয়া রাস্তায় ঘোরাঘুরি ও অনর্থক আড্ডা
কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির ভিত্তিহীন ও বিদআতি প্রথা
পরদিন ১৫ই শাবানের নফল রোজা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা ও অপচয়

আরও পড়ুন:

তওবা করার পূর্ণাঙ্গ নিয়ম (Complete Rules of Repentance)

তওবা (Repentance) মানে হলো গুনাহ থেকে ফিরে আসা। তওবা কবুল হওয়ার জন্য ৪টি শর্ত পূরণ করা জরুরি:

  • ১. গুনাহ স্বীকার করা: আপনি যে ভুলটি করেছেন তা মনে মনে স্বীকার করা।
  • ২. অনুতপ্ত হওয়া: কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়া।
  • ৩. গুনাহ ত্যাগ করা: তৎক্ষণাৎ সেই পাপ কাজটি ছেড়ে দেওয়া।
  • ৪. দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা: ভবিষ্যতে আর কখনো ওই গুনাহ করবেন না বলে মনস্থির করা।

তওবা করার পদ্ধতি:

  • ভালোভাবে অজু করে একাগ্রতার সাথে দুই রাকাত 'সালাতুত তওবা' (তওবার নামাজ) পড়ুন।
  • নামাজের পর হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসুলের (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করে নিজের সব গুনাহের জন্য মাফ চান।
  • বিশেষ করে 'সায়্যিদুল এস্তিগফার' পাঠ করা তওবার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

শবে বরাতের রাতে পড়ার মতো ৫টি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া (Key Supplications)

১. সর্বোত্তম তওবার দোয়া (Sayyidul Istighfar):

আরবি: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বি লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা...। অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা।

২. গুনাহ মাফের ছোট দোয়া (Short Istighfar):

উচ্চারণ- আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম, আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি। অর্থ: আমি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী এবং আমি তাঁর দিকেই ফিরে যাচ্ছি।

৩. বিপদ থেকে মুক্তির দোয়া (Dua-e-Yunus):

উচ্চারণ- লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমিন। অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত।

আরও পড়ুন:

৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া (Dua for Protection from Hell):

উচ্চারণ- আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার। (৭ বার পাঠ করা উত্তম) অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।

৫. মা-বাবার জন্য দোয়া (Dua for Parents):

উচ্চারণ- রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা। অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! তাদের (বাবা-মা) ওপর দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।

আমল চেকলিস্ট: শবে বরাতের বিশেষ দোয়া ও জিকির
আমল (Deed) ফজিলত (Virtue)
সায়্যিদুল এস্তিগফার তওবা কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া।
সুুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি ১০০ বার পড়লে সাগরের ফেনা সমান গুনাহ মাফ হয়।
দরুদ শরীফ পাঠ দোয়া কবুল হওয়ার জন্য অপরিহার্য।
তৃতীয় ও চতুর্থ কলিমা আল্লাহর মহিমা ও তাওহীদের ঘোষণা।

আরও পড়ুন:


এসআর