এ সমস্যার ফলে হাড় দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে এবং স্নায়ু ও হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমিত ও সচেতন থাকা জরুরি।
হাইপারক্যালসেমিয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—অতিরিক্ত প্যারাথাইরয়েড হরমোন, কিছু ক্যান্সার, অতিরিক্ত ভিটামিন ডি, কিছু ওষুধ ও পানিশূন্যতা। কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায় যে, কোনো ব্যক্তি হাইপারক্যালসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, যেমন: ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত প্রস্রাব ও কিডনিতে পাথর হতে পারে।
বয়সভেদে প্রতিদিন ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা:
প্রতিদিন প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বয়স ও লিঙ্গভেদে ভিন্ন হয়, তবে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১ হাজার মিলিগ্রাম, কিশোর-কিশোরীদের জন্য ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম, এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারী ও ৭০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের জন্য ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম প্রয়োজন হয়, যা দুধ, দই, ছোট মাছ ও সবুজ শাকসবজি থেকে পূরণ করা যায়।
বয়স অনুযায়ী ক্যালসিয়ামের চাহিদা (মিলিগ্রাম/দিন):
- শিশু (৪-৮ বছর): ১ হাজার মিলিগ্রাম
- কিশোর-কিশোরী (৯-১৮ বছর): ১ হাজার ৩০০ মিলিগ্রাম
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৯-৫০ বছর): ১ হাজার মিলিগ্রাম (নারী ও পুরুষ)
- প্রাপ্তবয়স্ক নারী (৫১-৭০ বছর): ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম
- প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ (৫১-৭০ বছর): ১ হাজার মিলিগ্রাম
- নারী ও পুরুষ (৭১+ বছর): ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা বেশি থাকে।
- শরীরে ভিটামিন ডি-এর অভাবে ক্যালসিয়াম শোষণ হয় না, তাই পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি গ্রহণও জরুরি।
রক্তে ক্যালসিয়াম পরিমাপের দুটি পরীক্ষা:
দুভাবে রক্তে ক্যালসিয়াম পরীক্ষা করা যায়। এর মধ্যে একটি হলো— ‘সিরাম ক্যালসিয়াম পরীক্ষা’ (Serum Calcium Test), যা রক্তে মোট ক্যালসিয়ামের পরিমাণ মাপে; আরেক প্রকার পরীক্ষা হলো ‘আয়নাইজড ক্যালসিয়াম পরীক্ষা’ (Ionized Calcium Test), যা শুধুমাত্র মুক্ত (free) ক্যালসিয়াম পরিমাপ করে এবং অপেক্ষাকৃত বেশি নির্ভুল। এটি হাড়ের স্বাস্থ্য, পেশী ও স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য জরুরি।
অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো:
কিডনি: অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কিডনির উপর চাপ সৃষ্টি করে, যা কিডনিতে পাথর জমা, কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস এবং কিডনি বিকল হওয়ার কারণ হতে পারে।
হাড় ও পেশী: রক্তে ক্যালসিয়াম বেড়ে গেলে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম বেরিয়ে আসে, যা হাড়কে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তোলে এবং হাড়ে ব্যথা ও পেশীর দুর্বলতা সৃষ্টি করে।
হৃদপিণ্ড: গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দনের অনিয়ম, দ্রুত বা ধীর হৃদস্পন্দন এবং অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র: ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, মনোযোগের অভাব, বিষণ্নতা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি বা কোমা পর্যন্ত হতে পারে।
পরিপাকতন্ত্র: বমি বমি ভাব, পেট ব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ হতে পারে।
অন্যান্য: অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে, যা শরীরে পানিশূন্যতার সৃষ্টি করে।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর সম্পর্ক:
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি একে অপরের পরিপূরক, যেখানে ভিটামিন ডি শরীরের জন্য ক্যালসিয়াম শোষণ করা অপরিহার্য, যা হাড় ও দাঁতকে শক্তিশালী রাখতে এবং পেশীর কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; পর্যাপ্ত ভিটামিন-ডি ছাড়া শরীর ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে না, ফলে হাড় দুর্বল হয়, তাই সুস্থ হাড়ের জন্য উভয়ের সঠিক মাত্রা প্রয়োজন। ভিটামিন ডি-এর প্রধান কাজ হলো ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ানো, যা হাড়ের খনিজকরণ ও মজবুত করার জন্য অপরিহার্য।
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা:
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবারের তালিকায় আছে দুগ্ধজাত খাবার (দুধ, দই, পনির), সবুজ শাক-সবজি (পালং, সজনেপাতা, ব্রকলি, কচুশাক), ডাল ও মটরশুটি, বাদাম ও বীজ (তিল, চিয়া, কাঠবাদাম), মাছ (কাঁটাসহ ছোট মাছ, সার্ডিন) এবং সয়াবিন ও টোফু; এছাড়া কমলা ও ডুমুরের মতো ফল এবং ক্যালসিয়াম-ফোর্টিফাইড খাবারও ভালো উৎস।
দুগ্ধজাত খাবার: দুধ, দই, পনির
শাক-সবজি: পালং শাক, কচুশাক, সজনেপাতা, ব্রকলি, ঢেঁড়স, বাঁধাকপি, সরিষা শাক, কেল (Kale), কলার্ড গ্রিনস, পাক চয়
ডাল ও শস্য: মটরশুটি, মসুর ডাল, রাজমা, মুগ ডাল, আমরান্থ, কুইনোয়া
বাদাম ও বীজ: তিল, সূর্যমুখীর বীজ, কুমড়ার বীজ, কাঠবাদাম, চিয়া সিড,
মাছ ও সামুদ্রিক খাবার: কাঁটাসহ ছোট মাছ (যেমন সার্ডাইন)
ফল: কমলা, ডুমুর, কিশমিশ, তরমুজ
অন্যান্য: সয়াবিন ও সয়া দুধ, ক্যালসিয়াম সেটেট দিয়ে তৈরি টোফু, ক্যালসিয়াম যোগ করা সিরিয়াল, রুটি এবং উদ্ভিজ্জ দুধ
সাপ্লিমেন্ট বনাম প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম:
প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম (খাবার থেকে প্রাপ্ত) সাধারণত সাপ্লিমেন্টের চেয়ে ভালো, কারণ এতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে, যা শোষণ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। এর সাথে কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির সম্পর্ক কম। তবে যাদের খাদ্যে ঘাটতি আছে তাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট উপকারী হতে পারে, বিশেষত চিকিৎসকের পরামর্শে। কারণ সাপ্লিমেন্টগুলো অতিরিক্ত গ্রহণ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য) ও কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের অতিরিক্ত সেবনে শরীরে ক্যালসিয়ামের আধিক্যে হাইপারক্যালসেমিয়ার অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। তাই এ ট্যাবলেট সেবনের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। ক্যালসিয়াম কার্বনেট হলো একটি সাদা, কঠিন রাসায়নিক যৌগ, যা সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।





