বিটিআরসির এনইআইআর (what is NEIR) কী এবং কেন প্রয়োজন?
এনইআইআর হলো বিটিআরসির একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেম যেখানে বাংলাদেশের সচল সকল বৈধ হ্যান্ডসেটের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অবৈধভাবে আমদানিকৃত বা চোরাই পথে আসা ফোন শনাক্ত করা। যদি আপনার হ্যান্ডসেটটি এনইআইআর সিস্টেমে (NEIR system) নিবন্ধিত না থাকে, তবে সেটি নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
- এটি কী: এটি মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ বা সিস্টেম, যা একটি দেশের (যেমন বাংলাদেশের বিটিআরসি) টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিচালনা করে।
- কাজ: এই সিস্টেমে দেশের সব বৈধ মোবাইল ফোনের IMEI নম্বর সংরক্ষিত থাকে। এটি ব্যবহারকারীর সিম কার্ড এবং এনআইডি (NID) কার্ডের সাথে ফোনের আইএমইআই নম্বরকে লিংক করে দেয়।
- উদ্দেশ্য: অবৈধ পথে আসা ফোন শনাক্ত করা, মোবাইল চুরি রোধ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন:
IMEI.info কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
আইএমইআই ডট ইনফো (IMEI.info) হলো একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন টুল বা ওয়েবসাইট যার মাধ্যমে যেকোনো ফোনের হার্ডওয়্যার তথ্য, তৈরির তারিখ এবং ওয়ারেন্টি স্ট্যাটাস চেক করা যায়। ফোনের কি-প্যাডে #06# ডায়াল করলে যে ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বরটি পাওয়া যায়, তা এই পোর্টালে ইনপুট দিয়ে ফোনের আসল পরিচয় জানা সম্ভব। তবে বাংলাদেশে ফোনটি বৈধ কি না তা নিশ্চিত হতে বিটিআরসির ডাটাবেস চেক করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
- এটি কী: এটি প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি অনন্য (Unique) ১৫ ডিজিটের শনাক্তকরণ নম্বর। মানুষের যেমন আঙুলের ছাপ বা এনআইডি নম্বর থাকে, ফোনের জন্য তেমনি আইএমইআই নম্বর।
- কে দেয়: ফোন তৈরির সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এটি প্রতিটি হ্যান্ডসেটে বসিয়ে দেয়।
- কাজ: এর মাধ্যমে ফোনটি কোন মডেলের, কোথায় তৈরি এবং এর বর্তমান অবস্থা কী তা শনাক্ত করা যায়। ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে এই নম্বরের মাধ্যমেই ফোনটি ট্র্যাক বা ব্লক করা হয়।
- কীভাবে দেখবেন: ফোনের ডায়াল প্যাডে *#০৬# চাপলে আপনার ফোনের IMEI নম্বরটি দেখতে পাবেন।
বিটিআরসির এনইআইআর (NEIR) এবং আইএমইআই (IMEI) দুটি ভিন্ন জিনিস হলেও একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই দুটি শব্দই মোবাইল ফোনের নিরাপত্তা এবং নিবন্ধনের সাথে যুক্ত, কিন্তু এদের কাজ ভিন্ন। সহজ কথায় বলতে গেলে, IMEI হলো ফোনের পরিচয়পত্র, আর NEIR হলো সেই পরিচয়পত্র যাচাই করার সরকারি ডাটাবেস। নিচে এদের মূল পার্থক্যগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
বৈশিষ্ট্য আইএমইআই (IMEI) এনইআইআর (NEIR) পূর্ণরূপ International Mobile Equipment Identity. National Equipment Identity Register. মূল পরিচয় এটি প্রতিটি মোবাইল হ্যান্ডসেটের একটি অনন্য ১৫ ডিজিটের সিরিয়াল নম্বর। এটি বিটিআরসি কর্তৃক পরিচালিত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস বা সিস্টেম। পরিধি এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং ফোন তৈরির সময় কোম্পানি এটি নির্ধারণ করে। এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কে ফোন ব্যবহারের জন্য প্রযোজ্য। উদ্দেশ্য একটি হার্ডওয়্যারকে অন্যটি থেকে আলাদা করা এবং ফোনের স্পেসিফিকেশন জানা। অবৈধভাবে আমদানিকৃত, নকল বা চুরি হওয়া হ্যান্ডসেট শনাক্ত ও বন্ধ করা। পরিবর্তনযোগ্যতা এটি হার্ডওয়্যারের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত (পরিবর্তন করা বেআইনি)। এটি একটি তালিকা, যেখানে নিয়মিত নতুন ফোনের তথ্য যুক্ত বা বাদ দেওয়া হয়। যাচাই করার পদ্ধতি ফোনের ডায়াল প্যাডে *#06# ডায়াল করলে পাওয়া যায়। ১৬০০২ নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে বা বিটিআরসির পোর্টালে গিয়ে যাচাই করা হয়।
এদের মধ্যে সম্পর্ক কী?
IMEI হলো একটি তথ্য, আর NEIR হলো সেই তথ্য জমা রাখার ঘর। যখন আপনি ফোনে সিম কার্ড ঢোকান, তখন মোবাইল নেটওয়ার্ক আপনার ফোনের IMEI নম্বরটি সংগ্রহ করে NEIR সিস্টেমে পাঠিয়ে দেয়। NEIR তখন যাচাই করে দেখে যে এই IMEI নম্বরটি তাদের ডাটাবেজে (বৈধ তালিকায়) আছে কি না।
- যদি থাকে, তবে ফোনটি সচল থাকে।
- যদি না থাকে (যেমন- চোরাই পথে আসা ফোন), তবে সিস্টেম ফোনটিকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
কীভাবে চেক করবেন আপনার ফোনটি বৈধ কি না? (How to verify handset validity)
আপনার ব্যবহৃত বা নতুন কেনা হ্যান্ডসেটটি বৈধ কি না তা জানতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন: ১. ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন KYD <স্পেস> ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর। ২. মেসেজটি পাঠিয়ে দিন ১৬০০২ (16002) নম্বরে। ৩. ফিরতি মেসেজে বিটিআরসি আপনাকে জানিয়ে দেবে আপনার হ্যান্ডসেটটি বৈধ কি না।
আরও পড়ুন:
পুরানো ফোনের কী হবে? (What will happen to old phones)
বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, এনইআইআর সিস্টেম পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগে (অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২১-এর আগে) দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল থাকা সকল হ্যান্ডসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিটিআরসির ডাটাবেসে নিবন্ধিত হয়ে গেছে।
স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন (Automatic Registration): এনইআইআর চালুর আগে আপনি যে ফোনটি ব্যবহার করছিলেন, সেটি যদি বৈধ বা আনঅফিসিয়ালও হয়ে থাকে, তবুও সেটি সচল থাকলে সিস্টেম তাকে 'বৈধ' বা 'সচল' হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
বন্ধ হবে না: পুরনো বা ব্যবহৃত ফোনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, যদি সেগুলো ইতোমধ্যে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে।
সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন: আপনি যদি এখন কোনো পুরনো ফোন কিনতে চান, তবে কেনার আগে অবশ্যই ১৬০০২ নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে যাচাই করে নেবেন যে সেটি ডাটাবেসে আছে কি না। কারণ, মালিকানা পরিবর্তন না করলে বা ফোনটি ব্ল্যাকলিস্টে থাকলে ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
কেন কিছু ফোন বন্ধ হতে পারে? (Why some phones might get blocked)
শুধুমাত্র সেই ফোনগুলোই ঝুঁকির মুখে আছে যেগুলো:
- এনইআইআর চালুর পর অবৈধভাবে বা চোরাই পথে দেশে এসেছে।
- যেগুলোর আইএমইআই (IMEI) নম্বর ভুয়া বা ক্লোন করা।
- বিদেশ থেকে আনার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করা হয়নি।
আরও পড়ুন:
আপনার ফোন কোন তালিকায়? জেনে নিন হোয়াইটলিস্ট, ব্ল্যাকলিস্ট ও গ্রে-লিস্টের পার্থক্য
বিটিআরসি যখন কোনো হ্যান্ডসেট যাচাই করে, তখন সেটিকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। আপনার ফোনটি নেটওয়ার্ক পাবে কি না, তা নির্ভর করে সেটি কোন লিস্টে আছে তার ওপর:
হোয়াইটলিস্ট (Whitelist): এটি হলো বৈধ ফোনের তালিকা। যেসব হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) বিটিআরসির ডাটাবেসে নিবন্ধিত আছে, সেগুলো হোয়াইটলিস্টে থাকে। এই তালিকার ফোনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই বাংলাদেশের সকল সিমের নেটওয়ার্ক পাবে এবং সরকারিভাবে এগুলোকে সম্পূর্ণ বৈধ বলে গণ্য করা হয়।
ব্ল্যাকলিস্ট (Blacklist): এটি হলো নিষিদ্ধ বা অবৈধ ফোনের তালিকা। সাধারণত চোরাই পথে আসা, ছিনতাই হওয়া বা আইএমইআই ক্লোন করা ফোনগুলোকে বিটিআরসি ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করে। এই তালিকায় থাকা ফোনগুলোতে কোনো সিম কার্ড কাজ করবে না এবং এগুলোকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়।
গ্রে-লিস্ট (Gray-list): এটি হলো একটি অস্থায়ী বা 'পর্যবেক্ষণ' তালিকা। যেসব ফোনের তথ্য অসম্পূর্ণ অথবা বিদেশ থেকে আনার পর এখনো নিবন্ধন করা হয়নি, সেগুলোকে গ্রে-লিস্টে রাখা হয়। এই তালিকার ফোনগুলো প্রাথমিকভাবে নেটওয়ার্ক পেলেও নির্দিষ্ট সময়সীমার (যেমন: ১৫ বা ৩০ দিন) মধ্যে নিবন্ধন না করলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
বিদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে আসা বা উপহার পাওয়া মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলো বিটিআরসির এনইআইআর (NEIR) সিস্টেমে নিজে নিজে নিবন্ধন করার প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। আপনি ঘরে বসেই অনলাইনে এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারবেন। নিচে ধাপে ধাপে নিবন্ধন করার পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় নথির তালিকা দেওয়া হলো:
বিটিআরসি পোর্টালে মোবাইল ফোন নিবন্ধনের ধাপসমূহ (Step-by-Step Guide)
১. পোর্টালে অ্যাকাউন্ট তৈরি (Create an Account): প্রথমে বিটিআরসির অফিশিয়াল এনইআইআর পোর্টাল neir.btrc.gov.bd লিংকে প্রবেশ করুন। সেখানে আপনার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট তৈরি করার জন্য 'নিবন্ধন করুন' বা 'Sign Up' অপশনে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিন।
২. আইএমইআই (IMEI) নম্বর সংগ্রহ: আপনার ফোনের আইএমইআই নম্বরটি আগে থেকেই লিখে রাখুন। নম্বরটি পেতে ফোনের ডায়াল প্যাডে *#06# ডায়াল করুন।
৩. বিশেষ নিবন্ধনের আবেদন (Apply for Special Registration): অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করার পর 'বিশেষ নিবন্ধন' বা 'Special Registration' অপশনে যান। সেখানে আপনার ফোনের ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বরটি প্রদান করুন।
৪. প্রয়োজনীয় নথি আপলোড (Upload Required Documents): ফোনটি যে বৈধভাবে বিদেশ থেকে এসেছে তার প্রমাণস্বরূপ নিচের ডকুমেন্টগুলোর স্ক্যান কপি বা স্পষ্ট ছবি আপলোড করতে হবে:
- পাসপোর্টের ভিসা ও ইমিগ্রেশন পেজের কপি (Passport Copy with Visa/Immigration Seal)।
- পণ্য ক্রয়ের রসিদ (Purchase Receipt/Invoice) - যদি থাকে।
- উপহার হিসেবে পেয়ে থাকলে তার ঘোষণাপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়)।
- এয়ারপোর্ট কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (যদি ট্যাক্স প্রযোজ্য হয়)।
৫. আবেদন সম্পন্ন করা: সব তথ্য এবং ডকুমেন্ট আপলোড করার পর 'সাবমিট' বাটনে ক্লিক করুন। আপনার আবেদনটি বিটিআরসি কর্তৃক যাচাই-বাছাই করা হবে। যদি সবকিছু সঠিক থাকে, তবে আপনার ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআর ডাটাবেসে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন:
মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্কের নিয়মাবলী (Customs Duty Rules)
১. বিনা শুল্কে (Tax-Free): একজন যাত্রী বিদেশ থেকে আসার সময় সর্বোচ্চ ২টি ব্যবহৃত বা নতুন মোবাইল হ্যান্ডসেট সম্পূর্ণ বিনা শুল্কে আনতে পারবেন। এই ফোনগুলো বিটিআরসির পোর্টালে পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে ফ্রিতে নিবন্ধন করা যাবে।
২. শুল্ক প্রদান সাপেক্ষে (With Tax): বিনা শুল্কের ২টি ফোনের অতিরিক্ত আরও ৬টি ফোন (মোট ৮টি) শুল্ক বা ট্যাক্স পরিশোধ করে আনা যাবে। এই ক্ষেত্রে ফোন প্রতি নির্ধারিত হারে কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে।
ট্যাক্স বা শুল্কের হার (Tax Percentage)
সাধারণত স্মার্টফোন আমদানিতে মোট করের ভার (Total Tax Incidence - TTI) বেশ উচ্চ। অতিরিক্ত ৬টি ফোনের ক্ষেত্রে শুল্কের হার নিম্নরূপ:
স্মার্টফোন (Smartphone): বর্তমানে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে প্রায় ৫৭% থেকে ৫৮% পর্যন্ত মোট কর (Customs Duty + VAT + AIT) পরিশোধ করতে হতে পারে। এটি ফোনের মূল দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
ফিচার ফোন (Feature Phone): সাধারণ বা বাটন ফোনের ক্ষেত্রে শুল্কের হার কিছুটা কম হতে পারে (প্রায় ৩০% - ৩৫%)।
উপহার হিসেবে আনা ফোন: উপহার হিসেবে আনলেও যদি সেটি প্রথম ২টির অতিরিক্ত হয়, তবে একই হারে কর দিতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সাধারণত তাদের ডাটাবেসে থাকা ওই মডেলের নির্ধারিত মূল্য অথবা আপনার ক্রয়ের রসিদ (Invoice) যাচাই করে ট্যাক্স নির্ধারণ করে।
আরও পড়ুন:





