ইউরোপ
বিদেশে এখন
মস্কোর কনসার্টে হামলা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা
রাশিয়ার কনসার্ট হলে নৃশংস হামলার ঘটনায় আইএস-কে দায় স্বীকার করলেও বিভিন্ন মহল থেকে ধোঁয়াশা কাটছে না। চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলার সঙ্গে শুক্রবারের ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেক বিশ্লেষক। অনেকে আবার পুতিন প্রশাসনের নিরাপত্তাহীনতাকে দায়ী করছে। কেউ কেউ বলছেন, পুতিন নিজেই ঘটাতে পারেন এই কাণ্ড।

২০০০ সালে সন্ত্রাস দমনের নামে চেচেন গণহত্যার মাশুল পরের কমপক্ষে চার বছর গুণতে হয়েছে রাশিয়াকে। চেচেন যুদ্ধে ইতি টানার দাবিতে ২০০২ সালে দুদ্রবোভকা থিয়েটারে ৯১২ জনকে জিম্মি করে চেচেন যোদ্ধারা, যাতে প্রাণ যায় ১৩২ বন্দির। ২০০৪-এ একটি স্কুলে জিম্মিদশায় তিন শতাধিক এবং একই বছর দু'টি বিমান ও একটি পাতাল রেলে আত্মঘাতী বোমায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণ যায়, যার পেছনে ছিল চেচেনরা। শুক্রবার (২২ মার্চ) দুই দশকের ভয়াবহতম হামলায় থিয়েটারে প্রায় দেড়শ' প্রাণহানির ঘটনার সঙ্গে চেচেনদের হামলার ধরণ খানিকটা মিলে গেলেও এতে দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসএস।

দুই সপ্তাহ আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো বড় জনসমাগমে উগ্রপন্থীরা হামলা চালাতে পারে বলে গেল ৮ মার্চ মস্কোকে সতর্ক করেছিলো মার্কিন দূতাবাস। গোয়েন্দা জোট ফাইভ আই ইন্টেলিজেন্স অ্যালায়েন্সের সদস্য হিসেবে মার্কিন সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের মস্কো ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল যুক্তরাজ্যও।

হুঁশিয়ারি অনুযায়ী দু'দিনের মধ্যে হামলা না হলেও দুই সপ্তাহ পেরোনোর আগেই মস্কোর কনসার্ট হলে সন্ত্রাসী হামলায় হতবাক বিশ্ব। ইউক্রেনে সেনা অভিযান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতার কারণে সতর্কবার্তা খুব একটা গায়ে লাগায়নি রাশিয়া, উঠছে এমন অভিযোগ। যদিও মস্কোর দাবি, পরিষ্কার কোন তথ্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।

এ হামলায় আইএস এর দায়স্বীকার মার্কিন প্রশাসনের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও রাশিয়া হামলার জন্য দায়ী করছে ইউক্রেনকে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, আটক চার সন্দেহভাজন পালাতে যাচ্ছিল ইউক্রেন সীমান্ত দিয়ে। অন্যদিকে, রুশ নিয়ন্ত্রিত বিশ্বের সবচেয়ে সহিংস আর সামরিক উপস্থিতির সীমান্ত দিয়ে সন্ত্রাসীদের পালানোর চেষ্টায় ক্রেমলিনের দিকেও সন্দেহের তীর পশ্চিমাদের। যদিও ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমা সমর্থন হারানোর মতো কোন কাজই ইউক্রেন করবে না।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা আবার বলছে অন্য কথা। রুশ বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে আলজাজিরা বলছে, হামলার শিকার কনসার্ট হলে নিরাপত্তা পর্যাপ্ত ছিল না। মস্কোতে নিরাপত্তাকর্মীদের চাকরি সবচেয়ে কম বেতনের বলে দায়িত্ব পালনে তাদের অবহেলা নিয়মিত বিষয়। শুক্রবারের হামলাকে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা কর্মী আর নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

আইএসকে হামলার জন্য দায়ী মানতে নারাজ অনেক বিশ্লেষকও। তারা বলছেন, নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে এ ধরনের কাণ্ড ঘটানোর ইতিহাস আছে খোদ রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনেরই। যদিও এসব দাবির পক্ষে নেই কোনো প্রমাণ।

জার্মানিতে থাকা রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের এক গুপ্তচর আল জাজিরাকে জানান, ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাস পর অ্যাপার্টমেন্টে বিস্ফোরণে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়, যেখানে ক্রেমলিন চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করে দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। সেইসময় পুতিনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে চলে যায় আর ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ান তিনি। সেসময় সাবেক এফএসবি কর্মকর্তা দাবি করেন, পুতিন নিজেই এই হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এরপর পুতিন তাকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করেন, ২০০৩ সালে তার মৃত্যু হয়।

সংবাদ মাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদন বলছে, শুক্রবারের এই হামলা শক্তিশালী নেতা পুতিনের জন্য কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, নিজ দেশেই শত্রুপক্ষ আর তাদের নিরলস কার্যক্রম এখনও চলমান আছে। এ ধরনের টার্গেট থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাশিয়ার নেই। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, রুশ নাগরিকরা কি আবারও নিজেদের নিরাপত্তার ভার পুতিনকে দেবে?

এসএসএস