অপরাধ ও আদালত
দেশে এখন

'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচারের একমাত্র বাধা'

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারের হত্যার বিচারের পথ সব বন্ধ করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা ছিল বলে মত দিয়েছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এটি আইনে পরিণত করে সংসদে পাশ করেছিলেন জিয়াউর রহমান। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, 'একটি দেশের স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যার পর তার বিচার করা যাবে না, এর চেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হতে পারে না।' আর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'খুনিদের রক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের একমাত্র বাধা।'

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ভোর বেলা স্বাধীনতার স্থপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে হামলা করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী সদস্য। অতর্কিত হামলায় চালায় মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবের বাসভবনে। একে একে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি রক্তে ভাসিয়ে দিয়েছিল খুনিরা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পরই দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করে খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি ও তাদের বিচার করা যাবে না এই মর্মে সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেন। সংসদে জিয়া সরকার আইন পাস করার পর রুদ্ধ হয়ে যায় স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের সব পথ।

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে সংসদে ওই বছরের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইনটি বাতিল করে উন্মুক্ত করা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দ্বার। ধানমন্ডি থানায় করা মামলায় ১৯৯৮ সালে ৮ নভেম্বর ১৫ জনকে ফাঁসির দণ্ড দেয় বিচারিক আদালত। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসলে আবার বিচার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

২০১০ সালে সুপ্রিমকোর্ট সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ হয়। পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল। পরে আপিল শেষে বহাল রাখা হয় ১২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায়।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ আইন করে বন্ধ করা ছিল স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ। কারও হত্যার বিচার করা যাবে না, এ ধরনের আইন ইতিহাসে বিরল। এভাবেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে তুলে ধরেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

ইতিহাস বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, 'আমাদের সংবিধান হলো ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করা সংবিধান। সেই সংবিধানকে কলঙ্কিত করা হলো, তাও এমনভাবে করা হলো যে, এতো দীর্ঘ বছরের বেশি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো মামলা পর্যন্ত করা যায়নি। এটা খুবই দুঃখজনক।'

বঙ্গবন্ধুর হত্যার আসামিদের বিচার করার জন্য বিচারপতি পাওয়া যাচ্ছিল না। আইন করে বিচার বন্ধ করা ছিল বিচার বিভাগের জন্য কালো অধ্যায়। জানালেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, দুনিয়ার কোথাও এমন আউন নেই, যে আইনের মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধকে বিচারের আওতা থেকে বহির্ভূত রাখা হয়। বাংলাদেশ দুর্ভাগা দেশ হিসেবে সেটা করা হয়েছিল। মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে বিচার পাওয়ার অধিকার। সেই অধিকারকে তারা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে এই আইনের মাধ্যমে, সেই আইনকে বাতিল করা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর শুধু একজন বিচারকের অভাবে বিচার করা হয়নি।'

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচার করা হলেও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল ডালিম, মেজর রাশেদ, মেজর নুর, আবদুর রশিদ ও মোসলেম উদ্দিনকে দেশে ফিরিয়ে শাস্তি কার্যকর করা যায়নি। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছেন।

এমএসআরএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর