ঢাকাই সিনেমার আকাশে ধুমকেতুর গতিতে আবির্ভূত হওয়া এক চিরসবুজ নক্ষত্র সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার আর মাত্র ২৭টি ছবি দিয়ে যিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনপ্রিয়তার চূড়ায়।
কিন্তু ১৯৯৬ এর ৬ সেপ্টেম্বর, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোকময় অধ্যায়ে থাকা অবস্থাতেই, মাত্র ২৫ বছর বয়সেই এই ক্ষণজন্মা নায়কের অকাল ও রহস্যঘেরা প্রয়াণ চিরতরে বিষাদের চাদরে ঢেকে দেয় গোটা দেশকে।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে অপমৃত্যু, আত্মহত্যা আর পারিবারিক কলহের তত্ত্বে ঘুরপাক খাচ্ছে এই মৃত্যুরহস্য। সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত, র্যাব কিংবা পিবিআই-সব সংস্থাই একে ‘আত্মহত্যা’ বলে আসলেও, মানতে পারেনি তার পরিবার।
সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী বলেন, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তো সাজানো আমরা বারেবারে বলতেছি। তারপরে ফার্স্ট টাইম যখন মরদেহ তোলা হইলো তখনও মরদেহ ঠিক ছিল। ডাক্তাররা বলছে, বাচ্চারা স্টুডেন্টরা দেখছে তারা বলছে, পথচারী বলছে, সাংবাদিক বলছে।’
অবশেষে আদালতের নির্দেশনায় গত বছর রমনা থানায় মামলাটি রূপ নেয় হত্যা মামলায়। এতে সালমান শাহের স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে সেখানে আসামি করা হয়।
আরও পড়ুন:
মৃত্যুর ৩০ বছর পর এবার সেই হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে সালমান শাহের দেহাবশেষ পুনরায় কবর থেকে উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে অনুমতি দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। কিন্তু এখানে বড় প্রশ্ন- এতদিন পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে কতটুকু সত্য উদঘাটন সম্ভব?
ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘কিছু পয়জনিংয়ের ক্ষেত্রে মৃতের হাড় থেকে নির্ধারণ করা যায়। সেগুলো করা যেতে পারে যেমন আমি যদি বলি আর্সেনিক খেয়ে যদি কেউ মারা যায় তখন ওইটা বুঝা যাবে যে তার বডিতে আর্সেনিক আছে কি নাই। কোনো হেভি মেটাল কোনো পয়জনিংয়ে যদি সে মারা যায় সেটা হয়তোবা ডিটেক্ট করা যায়।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের স্টেটমেন্টে একটা জায়গায় আছে তাকে চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে এবং আমাদের কিছু ইউপিএসএল আলামত পাওয়া গিয়েছিল চেতনানাশক ওষুধের। সেই কারণেই হয়তো তার মরদেহটা উত্তোলন করতে চাচ্ছে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। তবে যে মাত্রার ড্রাগ এখানে ছিল বা চেতনানাশক ওষুধের যে মাত্রাটা ছিল এতদিন পরে এটা পাওয়া যাবে কি না এটা আদৌ বলা মুশকিল।’
সালমানের মা নীলা চৌধুরী বলছেন, মরদেহ উত্তোলনের মতো প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মূল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা হোক।
নীলা চৌধুরী বলেন, ‘মরদেহ উত্তোলন করে আবার আলামত বের করার প্রহসনটা কেন হচ্ছে? এটা না করে আসামি গ্রেপ্তার করে আসামির জবানবন্দি থেকে সামিরার বাবা, সামিরা, সামিরার মা, তার বউ যে ঘরে ছিল যার স্বামী যে নিহত হইলো। তার স্ত্রীর কাছ থেকে জবানবন্দি নেয়া খুব দরকারি।’
আরও পড়ুন:
আইনজীবী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, শুধু ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে সিআইডিকে জোর দিতে হবে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং সে সময়ের ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর।
ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন বলেন, ‘বিদেশে এমন কোনো ল্যাব নেই যে পরীক্ষা করে বলা যাবে যে এটা একটা শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হইছে। সেটা বলা খুব টাফ জিনিস।’
ফারুক আহমেদ বলেন, ‘স্বামী স্ত্রী যদি একটা ঘরে থাকে, স্বামী মারা যায় বা স্ত্রী মারা যায় তাহলে তাকেই দায় করতে হবে, বলতে হবে যে তার স্ত্রী কীভাবে মারা গেছে তার স্বামী কীভাবে মারা গেছে। এই মামলায় যারা আসামি আছে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন, নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। সারকামস্টেন্সিয়াল যে এভিডেন্স আছে সেগুলা নিয়ে এভিডেন্সে আছে সেগুলো নিয়ে তদন্তে আগানো উচিত।’
আগামী ২৩ জুন এই মামলার প্রতিবেদন জমার দিন ধার্য রয়েছে। ৩০ বছরের পুরনো ধুলোপড়া রহস্যের জট এবার আদৌ খুলবে, নাকি প্রিয় নায়কের মৃত্যুরহস্য চিরকালই মাটির নিচে অন্ধকারেই থেকে যাবে; সেই উত্তরের অপেক্ষায় কোটি ভক্ত।





