দেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন এক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক প্রতীক। তার গান যেমন তরুণদের উচ্ছ্বাসের ভাষা হয়ে উঠেছিল, তেমনই সমাজের বাস্তবতাও উঠে এসেছে তার সুর ও কথায়।
আজম খানের সংগীতপ্রেমের শুরু শৈশব থেকেই। তবে সংগীতের শক্তিকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭১ সালে ২ নম্বর সেক্টরের একজন সেকশন কমান্ডার হিসেবে তিনি সরাসরি অংশ নেন গেরিলা যুদ্ধে। যুদ্ধের ফাঁকে সহযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে সাহস জুগিয়েছেন, ক্লান্ত মনকে উজ্জীবিত করেছেন।
স্বাধীনতার পর সেই যুদ্ধজয়ের চেতনাকেই তিনি বয়ে আনেন সংগীতে। গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’। পশ্চিমা রক ও দেশিয় সুরের মিশেলে তৈরি তার গান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা গানে তিনি এনে দেন নতুন এক ধারা, যা পরবর্তী সময়ে ‘বাংলা পপ’ নামে পরিচিতি পায়।
আরও পড়ুন:
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের হতাশা, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য ও তরুণদের স্বপ্নভঙ্গ খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন আজম খান। সেই বাস্তবতা উঠে আসে তার বিখ্যাত গান ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’। গানটি শুধু বিনোদন নয়, ছিল সময়ের সমাজচিত্র।
এরপর একে একে জনপ্রিয় হয় ‘আলাল ও দুলাল’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘অভিমানী’, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’-সহ অসংখ্য গান। তার সহজ ভাষা, স্বতন্ত্র গায়কী ও গিটারনির্ভর সুর তরুণদের মধ্যে নতুন এক উন্মাদনা তৈরি করে।
সংগীতবোদ্ধারা মনে করেন, বাংলা ব্যান্ড ও পপ সংগীতের বিকাশে আজম খানের অবদান মৌলিক। পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় সব ব্যান্ডশিল্পীই কোনো না কোনোভাবে তার প্রভাব বহন করেছেন।
আজম খানের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে গান তৈরি করতেন। খাতা-কলমে লিখে রাখার অভ্যাস ছিল না। মুহূর্তের আবেগ থেকেই তৈরি হতো তার সুর ও কথা।
তার ব্যান্ডসঙ্গীরা প্রথম তাকে ‘গুরু’ বলে ডাকতে শুরু করেন। পরে পুরো সংগীতাঙ্গন ও শ্রোতাদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘গুরু’। তবে ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ ও নিরহংকার।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত গান তাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ কিংবা ‘চার কলেমা সাক্ষী দেবে’র মতো গান আজও শ্রোতাদের আবেগ ছুঁয়ে যায়।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও দেখা গেছে তাকে। ‘কালা বাউল’ নাটক এবং ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয় দেন।
সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পেলেও মানুষের ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় অর্জন।
জীবনের শেষদিকে অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাকে। দেশে ফিরে একবার বলেছিলেন, বিদেশে তার দম বন্ধ হয়ে আসত, কিন্তু ঢাকার মাটিতে পা রাখতেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। সেই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার দেশপ্রেম ও মাটির প্রতি টান।
যে মানুষটি স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন, আবার স্বাধীন দেশের তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন গিটার; তিনি আজও বেঁচে আছেন তার গান, স্মৃতি ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে আজম খান তাই কেবল একজন শিল্পী নন; তিনি এক অনন্ত প্রেরণার নাম।





