দুর্যোগ ও অপরাধের কনটেন্টে শিশুদের দায়িত্বহীন উপস্থাপন (Child Safety in News Media)
বিশেষ করে বন্যা (flood), ঘূর্ণিঝড় (cyclone) বা অগ্নিকাণ্ডের মতো নানা দুর্যোগের সময়; কিংবা অপরাধের শিকার (child victim) ও দুস্থ শিশুদের ছবি-ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক সময় সস্তা আবেগ তৈরি বা ভিউ পাওয়ার উদ্দেশ্যে শিশুদের খালি গায়ে, অর্ধনগ্ন বা আপত্তিকর অবস্থায় ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া এসব অসতর্ক দৃশ্য যে একটি শিশুর পুরো ভবিষ্যৎকে কতটা অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, তা এখন গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
সহানুভূতির আড়ালে শিশুর সম্মানকে পণ্য বানানোর চর্চা (Ethical Journalism and Child Privacy)
অনেকের ধারণা, দুস্থ, ক্ষুধার্ত বা অপরাধের শিকার শিশুর কান্নারত কিংবা জরাজীর্ণ ছবি প্রকাশ করলে মানুষের সহানুভূতি বাড়ে বা সহজে সাহায্য (child donation) পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক সাংবাদিকতার বৈশ্বিক নীতি (journalism ethics) এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন (Bangladesh law) কোনোভাবেই শিশুর পরিচয়, নগ্নতা বা গোপনীয়তা (child privacy) ফাঁসের এ চর্চাকে সমর্থন করে না। সাহায্যের উসিলায় একটি শিশুর শরীর বা তার সম্মানকে পণ্য বানানো এক ধরনের নৈতিক স্খলন, যা আমাদের সমাজকে দিন দিন আরও অসংবেদনশীল করে তুলছে।
বাংলাদেশের ‘শিশু আইন ২০১৩’ এবং গোপনীয়তার আইনি সুরক্ষা (Child Act 2013 Bangladesh)
বাংলাদেশের ‘শিশু আইন ২০১৩’ (Child Act 2013 Bangladesh)-তে শিশুর সুরক্ষা ও গোপনীয়তা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী অপরাধের শিকার, আইনের সংস্পর্শে আসা কিংবা কোনো মামলার সাক্ষী হিসেবে থাকা শিশুর এমন কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, যা দিয়ে তার পরিচয় (child identity) সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুর ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে তার শারীরিক বা সামাজিক মর্যাদাহানি ঘটে, কিংবা তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে, এমন কিছু প্রচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভুক্তভোগী শিশুর সাক্ষাৎকার নেয়ার নামে তাকে ক্যামেরার সামনে বসিয়ে এমন সব প্রশ্ন করা হয়, যা তাকে মানসিকভাবে দ্বিতীয়বার হেনস্তা বা ‘রিসিক্টিমাইজড’ (revictimization) করে তোলে।
আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ ও শিশুর ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ (UNCRC Article 16 Child Rights)
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর অধিকারকে স্পষ্টভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো শিশুর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বাড়ি কিংবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং তার সামাজিক সুনামে আঘাত করা চলবে না। সনদের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল কথাই হলো, শিশুর যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তার ‘সর্বোত্তম স্বার্থ’ (best interests of the child) সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। একটি শিশুর আপত্তিকর ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ করা কখনোই তার জন্য কল্যাণকর হতে পারে না, বরং তা তার অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সাইবার আইনের লঙ্ঘন এবং অনলাইনের তদারকি সংকট (Cyber Security Law Bangladesh)
এর পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (digital platform) বা সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুদের ছবি বা ভিডিও এমনভাবে প্রকাশ করা, যা তাকে সামাজিকভাবে হেয় করে বা তার নগ্নতা প্রদর্শন করে, তা দেশের প্রচলিত সাইবার আইনের (cyber law Bangladesh) অধীনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ভিউ বাড়িয়ে পেজের ফলোয়ার বাড়ানোর লোভে শিশুর এ ধরনের সংবেদনশীল দৃশ্য ধারণ ডিজিটাল পর্নোগ্রাফি বা শিশু নির্যাতনের (child abuse) শামিল হতে পারে। আইন থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সঠিক তদারকি ও সদিচ্ছার অভাবে অনলাইনের আনাচে-কানাচে শিশুদের সুরক্ষা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত (Digital Footprint Impact on Children)
গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি বা ভিডিও হয়তো স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেসে ওঠে এবং সেটি স্ক্রল করে চলে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারনেটের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টে (digital footprint) তা থেকে যায় আজীবন। অসচেতনভাবে বা অতি-উৎসাহী হয়ে শিশুদের এভাবে নেতিবাচক উপায়ে উপস্থাপন করলে তাদের জীবনে যে দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি হয়, তা কোনো টাকা বা পুনর্বাসন দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। যে শিশুটির কান্নারত ছবি আজ লাখ লাখ মানুষের টাইমলাইনে ঘুরছে, সে যখন বড় হবে, তখন এই একই দৃশ্য তাকে তীব্র হীনমন্যতায় ভোগাবে। সহপাঠী বা সমাজের মানুষের কাছে উপহাসের পাত্র হওয়ার ভয়ে সে তীব্র মানসিক ট্রমা (child mental trauma), সমাজবিমুখতা বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে, যা তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব বিকাশে স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক কলঙ্ক এবং সাইবার অপরাধের নানামুখী ঝুঁকি (Social Stigma and Pedophile Online Safety)
সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমার (social stigma) বিষয়টি এখানে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। দুস্থ বা অপরাধের শিকার হওয়ার ছবি ইন্টারনেটে চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কারণে, শিশুটি বড় হয়ে যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চায়, ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে যায় কিংবা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চায়, তখন সে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। আমাদের সমাজ তাকে সব সময় তার ‘অতীতের সেই অসহায় ছবির’ ফ্রেমে দেখেই বিচার করতে শুরু করে। এছাড়া ইন্টারনেটে থাকা শিশুদের এ ধরনের ছবি পরবর্তীতে সাইবার অপরাধী বা পেডোফাইলদের (pedophile online safety) (শিশুদের প্রতি যৌন আসক্ত অপরাধী) হাতে পড়ার বিশাল ঝুঁকি থাকে, যা সরাসরি শিশুর জীবনকে বিপন্ন করে তোলে।
নৈতিক সাংবাদিকতা ও সংবাদকর্মীদের জন্য জরুরি নির্দেশিকা (Child Protection Media Guidelines)
নৈতিক সাংবাদিকতা বনাম ভিউয়ের বাণিজ্যের এ দ্বন্দ্বে কঠোর কিছু গাইডলাইন (child protection guidelines) মেনে চলা জরুরি। প্রথমত, কোনো শিশু যদি কোনো অপরাধ বা দুর্ঘটনার শিকার হয়, তবে কোনো অবস্থাতেই তার মুখমণ্ডল, নাম, ঠিকানা বা স্কুলের নাম প্রকাশ করা যাবে না; প্রয়োজনে বাধ্যতামূলভাবে ‘পিক্সেল ব্লার’ (blur face) বা শ্যাডো শট ব্যবহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ছবি তোলার সময় বা ভিডিও করার সময় তারা যথাযথভাবে ও শালীনভাবে পোশাক পরিহিত আছে কি না, তা সংবাদকর্মীকে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবমাননাকর বা অর্ধনগ্ন ছবি তোলা ও প্রকাশ থেকে শতভাগ বিরত থাকতে হবে, তা যত বড় সংবাদের উপাদানই হোক না কেন।
অভিভাবকদের সচেতনতা ও ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’-এর গুরুত্ব (Informed Consent in Child Journalism)
তৃতীয়ত, শিশুর ছবি বা বক্তব্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের স্পষ্ট এবং বুঝেশুনে দেয়া সম্মতি বা ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’ (informed consent) নিতে হবে। তবে অনেক সময় দেখা যায়, অসচেতনতার কারণে অভিভাবক রাজি হলেও সেই ছবি বা ভিডিওটি শিশুর ভবিষ্যতের জন্য মর্যাদাহানিকর হতে পারে; এমন ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নৈতিকতাবোধ থেকে তা প্রকাশ করা বন্ধ রাখতে হবে।‘সহানুভূতি’ বা ‘সাহায্য’ গাড়ের সস্তা অজুহাতে শিশুর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ভিউ বাড়ানোর এ বাণিজ্যিক মানসিকতা বর্জনই একমাত্র সমাধান।
টেকসই সমাধানের উপায় ও ‘চাইল্ড সেফগার্ড পলিসি’ (Child Safeguard Policy in Media)
আজকের শিশু আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া যেন কোনো শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের পথকে আজীবনের জন্য কণ্টকাকীর্ণ না করে, তার জন্য রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং সমাজের প্রত্যেক নাগরিককে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাময়িক উত্তেজনা বা কয়েকটা ভিউয়ের চেয়ে একটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুরক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশের প্রচলিত আইনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘চাইল্ড সেফগার্ড পলিসি’ (child safeguard policy) বা শিশু সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন ও তা কঠোরভাবে বজায় রাখাই হতে পারে এ সংকটের স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান।





