২ এপ্রিল থেকেই নতুন আরও শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। বাকি নেই দুই সপ্তাহও। কিন্তু পালটা ব্যবস্থা কী হবে? সে সিদ্ধান্ত নিতেই একজোট হলেন পূর্ব এশিয়ার তিন শীর্ষ অর্থনীতির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
বাণিজ্য যুদ্ধের চাপ বাড়তে থাকার মধ্যেই এ বৈঠক। চীনের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্কের আঁচ লেগেছে মিত্র জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরও। যদিও বৈঠকের আনুষ্ঠানিক আলোচ্য সূচিতে ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক যুদ্ধের প্রসঙ্গ। তবে এ বিষয়ে আলোচনা যে হবেই, অজানা ছিল না সেটিও।
যুক্তরাষ্ট্রের নাম উহ্য রেখেই বহুমুখী ও মুক্তবাণিজ্যের ধারা বজায় রাখার আহ্বান জানান চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আঞ্চলিক সহযোগিতা আর উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেও ওয়াশিংটন ইস্যুতে চাপা উদ্বেগ আড়াল করতে পারেননি তিনিও।
জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি আইওয়ায়া বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। এটা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে আমরা ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে আছি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি আর দ্বন্দ্ব আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, ’মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু করতে যোগাযোগ চালু রাখছে তিন পক্ষ। যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা আবারও শুরু হবে। পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক রাজধানীর এই সংযোগের পরিধি আরও বড় হবে।’
ঐতিহাসিকভাবেই খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নয় বেইজিং ও টোকিওর। ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিশোধিত পানি ছাড়তে শুরু করায় জাপান থেকে সামুদ্রিক খাদ্য পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে চীন, যা বহাল আছে আজও। পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপের মালিকানা নিয়েও আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়েছে দুই দেশ।
অঞ্চলটিতে নিয়মিত টহল জাহাজ ও বিমান পাঠায় দেশ দু'টি। আছে দেড়শো বছরের মধ্যে দু'টো যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। কিন্তু তাও অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে দেশ দু'টির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এতোটাই যে মার্কিন শুল্ক যুদ্ধের চাপ এড়াতে ছয় বছরে প্রথমবার সরাসরি অর্থনৈতিক আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিলো চীন ও জাপান।
বিশেষ করে চীন যেখানে জাপানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং জাপানের বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ারও যেমন প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। তেমনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও যেমন বেইজিংকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো তাই-ইউল বলেন, ‘কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এই তিন দেশের অভিন্ন স্বার্থ ও দায়িত্ব। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশনের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি জানিয়ে একতা ধরে রাখা কোরিয়া, জাপান ও চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
পূর্ব এশিয়ার ওপর মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের কালো ছায়া শুধু নয়, আছে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহযোগিতায় উত্তর কোরিয়ার সেনা পাঠানো এবং নিত্যনতুন অস্ত্র পরীক্ষা ইস্যুতে দুশ্চিন্তাও। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বৈরী অবস্থানের তুলনায় অনেকটাই নমনীয় চীন, একইসাথে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও অর্থনৈতিক শুভাকাঙ্ক্ষী।
সবমিলিয়ে বিশ্বজুড়ে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অবস্থান শক্ত রাখতে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতি ও মার্কিন আধিপত্য বিরোধী অন্যতম শক্তি চীনের সাথে ঐক্যেই সমাধান দেখছে এককালের প্রতিবেশী ও প্রতিপক্ষ দেশগুলো।