ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই দশকের দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি। একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ইরানকে কোণঠাসা করা আর অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেয়া তো আছেই; এ ইস্যু নিয়ে ইরানের উপর যুদ্ধও চাপিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে পরমাণু কর্মসূচিকে ছাপিয়ে সারা বিশ্বের নজর এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ- হরমুজ প্রণালিতে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকিও নিয়ে ফেলেছে ইরান। বছরের পর বছর ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধে আপত্তি জানানো ইরানি নেতারাই এখন পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধে প্রণালিটিকে দেখছেন নিজেদের তুরুপের তাস হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা হলেও শিপিং কোম্পানি ও ব্যবসায়ীরা কন্টেইনার ভাড়া নেয়ায় আগ্রহী হচ্ছে না। কারণ ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি বলে বীমা প্রিমিয়ামও আকাশছোঁয়া।
হরমুজে বেশ কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার সূচনা। এর জেরে আবারও ইরানের তেলের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের ছয় কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল আটকে আছে মাঝ সমুদ্রে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ত্রবিরতিতে ইতি টেনে ইরানি ভূখণ্ডে ফের হামলার নির্দেশ দেয়ার পর আবারও বিশ্ববাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম।
অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে হরমুজেও; হামলার জেরে লক্ষণীয় মাত্রায় কমেছে প্রণালীটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল। বুধবার হরমুজ প্রণালি পেরিয়েছে মাত্র ২৩টি পণ্যবাহী জাহাজ, যেখানে যুদ্ধের আগে স্বাভাবিক সময়ে এ সংখ্যা ছিল দৈনিক দেড়শ'র মতো; প্রতিদিন এর অর্ধেক জাহাজেই বহন করা হতো দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। এ পথেই আনা-নেয়া করা হয় বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশ, সমুদ্রজাত সারের ৩০ শতাংশ। ফলে হরমুজে উত্তাপ মানে শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্যপণ্য উৎপাদনের খরচও আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়া।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক সিনা আজোদি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি ইরানের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ। হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে টিকে আছে। তাই হরমুজে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে অন্যান্য দেশ যেন ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলে, সেটি নিশ্চিতের চেষ্টা করছে তেহরান।’
যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে ইরান বছরের পর বছর ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে আসলেও ভেতরে ভেতরে এ পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক এবং একে শেষ অবলম্বন হিসেবে দেখে তেহরান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ ইস্যুতে পিছু হঠলে, পরমাণু কর্মসূচি আর প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতসহ ইরানের বিভিন্ন বিষয়ে ফের চেপে বসবে ট্রাম্প প্রশাসন, এমনটাই শঙ্কা তেহরানের।




