ভোটার তালিকা থেকে বাদ মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব পরিবারের সদস্যরা!

মুসলিমদের নাম ঝেড়ে বাদ দেয়া হচ্ছে— মমতার অভিযোগ

শাহনুর শাকিব
কলকাতা
ছোটে নবাব রেজা আলী মির্জা, মমতা ব্যানার্জি
ছোটে নবাব রেজা আলী মির্জা, মমতা ব্যানার্জি | ছবি: এখন টিভি
1

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের মুখে ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধনের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল এসআইআর প্রক্রিয়া। এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখনো পর্যন্ত পাঁচটি সংশোধিত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সংশোধিত তালিকায় জায়গা হয়নি কয়েক লাখ ভুয়া ভোটারের নাম। যদিও শাসক দল বা তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ভোটারদের দাবি, তারা এই দেশেরই নাগরিক। চক্রান্ত করে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

সেই ভোটার তালিকা থেকে এবার মুর্শিদাবাদের ছোটে নবাব রেজা আলী মির্জাসহ পরিবারের এক শতাধিকের বেশি সদস্যের নাম ‘বাদ’ (ডিলিট) দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তারা আদৌ আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না তা নিয়ে এখন সন্ধিহান নবাব পরিবারের সদস্যরা।

যদিও ‘শুনানি’র নোটিশ পেয়ে নবাব বংশের সদস্যরা সব নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু শুনানির পরেও পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের নাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত তালিকা থেকে ‘ডিলিট’ করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশের সহায়তায় মসনদে বসেন মীর জাফর। বর্তমানে তার ১৫ তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ রেজা আলি মির্জা, (যিনি মুর্শিদাবাদে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত) এখনও ‘কিল্লা নিজামত’ এলাকার ঘণ্টা ঘরের কাছে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। রেজা আলির পুত্র ১৬তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জাও বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন। ‘কিল্লা নিজামত’ চত্বরে নবাব পরিবারের আরও বহু সদস্যর বাস। তাদের অনেকের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

আরও পড়ুন:

মীর জাফরের ১৬তম বংশধর তথা মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ফাহিম আলি মির্জা বলেন, ‘এসআইআর লাইনে ভিড় ও বাবার অসুস্থতার কারণে আমি বাবাকে বলেছিলাম যে একটা অথরাইজেশন লেটার পাঠিয়ে দিতে কিন্তু তিনি নিজেই সেই লাইনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। এরপর প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি জমা দেই। আমরা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম যে, সমস্ত নথি জমা দিয়েছি তাতে আমাদের নাম থাকবে। কিন্তু পরে দেখলাম যে আমার নবাব পরিবারের একশোর বেশি ভোট কেটে গেছে।’

মুর্শিদাবাদের লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২১ নম্বর বুথে যেখানে নবাবী পরিবারের সদস্যরা ভোট দেন সেখানে ওই একটি বুথে প্রায় ৮৫০-৯০০ ভোটারের মধ্যে ২৮৬ জনের নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের বেশিরভাগই নবাব পরিবারের। বাদ পড়া ভোটারদেরদের মধ্যেই রয়েছেন মহম্মদ রেজা আলি মির্জা, তার পুত্র সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম, বড় জ্যাঠা মুহম্মদ আব্বাস আলী মির্জার সন্তানরা।

এ নিয়ে ফাহিম আলি মির্জা বলেন, ‘১২১ নম্বর বুথের বসবাসকারী প্রায় ৯০০ ভোটারের মধ্যে ২৮৬ জনের নাম কাটা গেছে। কী কারণে হয়েছে আজ পর্যন্ত আমরা জানতে পারছি না।’

ফাহিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা নবাব পরিবারের সদস্য হলেও আমরা খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করি। ভাবতে অবাক হচ্ছি যে, যেখানে আমার বাপ দাদা মুর্শিদাবাদ শহর বানালো, হাজারদুয়ারি বানালো, ইমামবাড়া বানালো, কাটরা মসজিদ বানিয়েছে- অথচ আজকে নির্বাচন কমিশন আমাদের সঙ্গে এরকম ব্যবহার করছে!’

আরও পড়ুন:

তিনি বলেন, ‘আমরা তো কেউ বাইরে থেকে আসিনি। এই শহরবাসীর জন্য সবচেয়ে বড় অবদান আমার ঠাকুরদাদা সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জা। ১৯৪৭ সালে তিনি তখন সিটিং নবাব। তাকে পাকিস্তানের তরফে অনেকবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু উনি বলেছিলেন আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতীয়, আমরা ভারতের সঙ্গেই থাকবো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই মুর্শিদাবাদ শহর তিন দিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেষে আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপে খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। আজকে সেই বংশধরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এরকম ব্যবহার করলো।’

এ ব্যাপারে ৮২ বছর বয়সী সৈয়দ মহম্মদ রেজা আলী মির্জা বলেন, ‘আমরা নবাবের পরিবার, আমাদের ভোট দেয়ার অধিকার আছে। আমরা কেন ভোট দিতে পারবো না? আমরা যদি ভোট না দিই তবে আমাদের এখানে কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সেক্ষেত্রে হয় বাংলাদেশে যেতে হবে, না হলে অন্য কোথাও। এটা খুবই দুঃখের ব্যাপার।’

জানা গেছে, নাম বাদ যাওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে পারে নবাবের পরিবার।

এ ব্যাপারে মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক তথা এবার ওই কেন্দ্রের প্রার্থী গৌরিশঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘আমাদের দল বা নির্বাচন কমিশন কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিতে বলেনি। যদি কারো নাম কোনো কারণে বাদ গিয়ে থাকে তারা “ফর্ম-৬” পূরণ করে নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে পারবেন।’

এদিকে বেছে বেছে মুসলিমদের নাম বাদ দেয়া নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।

সোমবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলদায় নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে মমতা বলেন, ‘নোট বন্দির জন্য লাইন দিয়েছিল এবার ভোট বন্দির জন্য লাইন। এসআইআর মানে সর্বনাশ। ওদের জেতার তো কোনো সম্ভাবনা নেই। যত রকম চক্রান্ত, বদবুদ্ধি-সেগুলোকে ব্যবহার করছে। দেখে দেখে ভোট কেটেছে। সংখ্যালঘুদের তো ঝেড়ে কেটেছে।’

এসএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর
No Article Found!