২০১৯ সাল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো বিভিন্ন সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার অভিযোগে 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র।
এটি ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। যেখানে কোনো দেশ অন্য দেশের নিয়মিত সামরিক বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা দেয়। বিশ্লেষকেরা বলেন,তেহরানকে কোণঠাসা করতে এবং ইরানের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোতে আইআরজিসির বিপুল নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে এ পদক্ষেপ নেয় মার্কিন প্রশাসন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্বের কোনো সার্বভৌম দেশের সেনাবাহিনীকে আরেকটি দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারে?
হ্যাঁ। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। নিজস্ব জাতীয় আইন ও পররাষ্ট্রনীতির অধীনে অন্য একটি দেশের জাতীয় সেনাবাহিনীকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব।
ইরান তথা আই আর জিসির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি ছিল মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট।
এ আইন ব্যবহার করে ইরানের উপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। দেশটির বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাদের সঙ্গে সব আর্থিক লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়।
এমনকি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংশ্লিষ্ট দেশে প্রবেশাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। তৃতীয় কোনো পক্ষ সহযোগিতাকারী হিসেবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যবসা বা চুক্তি করলে তাদের বিরুদ্ধেও একই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনগুলোর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মার্কিন আদালতকে বিচারিক সুবিধা দেয়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও গ্রেপ্তার করার সুযোগ। সেক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিক বা সম্পদের ক্ষতিকারক হিসেবে এ সেনাবাহিনীর সদস্যকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আটক বা প্রত্যর্পণের দাবি জানাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
একইভাবে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এখতিয়ারে থাকা ওই সেনাবাহিনীর সব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত করাও সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো স্বাধীন দেশের জাতীয় সেনাবাহিনী সার্বভৌম দায়মুক্তি ভোগ করে। অর্থাৎ, এক দেশের আদালতের পক্ষে অন্য দেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া কঠিন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কোনো বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে ওই বাহিনীর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাকবচ বা আইনি দায়মুক্তি অস্বীকার করে। এতে ওই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে দেওয়ানি মামলা ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি পথ সুগম হয়।
এমনকি, জাতিসংঘের চার্টারের কোনো দেশের ওপর আক্রমণ করার বিধিনিষেধ পাশ কাটিয়ে, একতরফা সামরিক অভিযানের আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে দেশটি ২০০১ সালের নিজস্ব 'সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এমনটাই বলেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন,কোনো জাতীয় সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী তকমা দিলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করতে পারে যে, তারা কোনো 'রাষ্ট্রের' বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি 'সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর' বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।





