একই দিনে ইন্দোনেশিয়ায় দুই ভূমিকম্প; নিহত অন্তত ৪৭

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা | ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস
0

ইন্দোনেশিয়ায় একই দিনে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। আজ (শনিবার, ১৫ আগস্ট) পূর্বাঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার প্রথম কম্পনের পর পশ্চিমাঞ্চলের সুমাত্রা দ্বীপে ৬.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে বলে জানিয়েছে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে। সিবিএসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আরও কয়েক ডজন বাসিন্দা আহত হয়েছেন এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে সুনামি সতর্কতা জারি করে উপকূলীয় বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যেতে বলেছিল। তবে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপদার্থবিদ্যা সংস্থার পর্যবেক্ষণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না দেখায় পরে এই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।

ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর কেন্দ্র ছিল পূর্ব নুসা টেঙ্গারা প্রদেশের এন্দে শহর থেকে ৪২ মাইল উত্তর-উত্তর-পশ্চিমে। আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের পর অন্তত ২৩৫টি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে; যার সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ৬.২।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান সুহারইয়ান্তো জানিয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। এদের বেশির ভাগই সিক্কা, মাংগারাই ও পূর্ব মাংগারাইয়ের বাসিন্দা। অন্তত ৫০ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অনেকের মতো তিনিও একটি নামেই পরিচিত।

সুহারইয়ান্তো জানান, ভূমিকম্পে অন্তত ১৫৭টি বাড়ি ধসে পড়েছে এবং প্রায় ২০০ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার গ্রামবাসী বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পূর্ব নুসা টেঙ্গারার পুলিশপ্রধান রুদি দারমোকো জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বহু ভবন ধসে পড়েছে। শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তথ্য প্রবাহ ও উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দারমোকো বলেন, ‘আমরা ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রতিবেদন সংগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে।’ তিনি জানান, ভূমিকম্পের কারণে এন্দে রিজেন্সিতে ভূমিধসে ৪৩৫ মাইল দীর্ঘ ট্রান্স-ফ্লোরেস মহাসড়কও বন্ধ হয়ে গেছে। এই পাহাড়ি সড়কটি লাবুয়ান বাজো থেকে লারানতুকা পর্যন্ত ফ্লোরেস দ্বীপকে সংযুক্ত করেছে। এই ভূমিকম্পে স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও গির্জাসহ শতাধিক সরকারি স্থাপনাও ধ্বংস হয়েছে।

কেন্দ্র থেকে ৬০ মাইলের বেশি পশ্চিমে রুতেং শহরের বাসিন্দা ইয়ুলিয়ান জুইতা একালিয়া এএফপিকে বলেন, ‘আমি এত বড় ভূমিকম্প জীবনে অনুভব করিনি।’ ৩৭ বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, ‘মনে হয়েছিল আমরা যেন ট্র্যাম্পোলিনের ওপর আছি; সত্যিই ভয়ংকর ছিল। আমি বাইরে বের হতে যেতেই বাড়ির সব কিছু পড়ে গেল—টিভি, আমার ছেলের ট্রফি, থালা রাখার তাক, আলমারির ওপরের সুটকেস। আমি বাইরে বের হওয়ার সময় আমার ছেলে ও প্রতিবেশীরা আগেই সেখানে ছিলেন, ভয়ে চিৎকার করছিলেন।’

সিক্কার রাজধানী মাউমেরের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অফিসের প্রধান ফাথুর রহমান জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূমিধসে ফ্লোরেস দ্বীপের ছয়টি রিজেন্সির অনেক প্রত্যন্ত গ্রাম মাটি চাপা পড়েছে বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এতে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। স্থানীয় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, কম্পনের পর সতর্কতা হিসেবে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরিয়ে আনা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হাসপাতালের কর্মীরা বিছানা, আইভি স্ট্যান্ড ও অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ যন্ত্রপাতি বাইরে এনে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, লজিস্টিকস ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমে সহায়তা করতে একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে তারা। পূর্ব নুসা টেঙ্গারার ভৌগোলিক অবস্থার কারণে এই আকাশপথের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটি বহু দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং সেখানে পরিবহন ও প্রবেশাধিকারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, নাগেকেও রিজেন্সির প্রায় ২ হাজার গ্রামবাসী তাদের বাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন।

১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপের বিশাল দ্বীপপুঞ্জ ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ারে’ অবস্থিত। এ কারণে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির তৎপরতার প্রবণতা বেশি। ১৯৯২ সালে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট সুনামিতে ফ্লোরেস দ্বীপে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি উপকূলীয় এলাকা ভাসিয়ে ৪ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রার কাছে ৯.১ মাত্রার বিশাল ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামিতে এক ডজন দেশের ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এএম