ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে ধীরগতি; সামরিক বাহিনীর সমন্বয়হীনতার অভিযোগ

ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজের সময় উড়ছে ভেনেজুয়েলার পতাকা
ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজের সময় উড়ছে ভেনেজুয়েলার পতাকা | ছবি: রয়টার্স
0

ভেনিজুয়েলার উপকূলে গত মাসে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, দুর্যোগের পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রথম কয়েক দিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের কাছ থেকে আদেশ আসতে দেরি হওয়া, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং চরম বিশৃঙ্খলার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত আটজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে রয়টার্স এসব তথ্য জানিয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার এই ভূমিকম্পে প্রায় ৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থাসহ (ইউএসজিএস) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিহতের সংখ্যা এর দ্বিগুণ হতে পারে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লা গুয়াইরা রাজ্য। সেখানে দেশটির প্রধান বিমানবন্দর ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবস্থিত। এ ছাড়া রাজ্যটিতে কয়েক শ বহুতল আবাসিক ভবন পুরোপুরি বা আংশিক ধসে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগুয়েজ সরকারের উদ্ধার অভিযানের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেনাবাহিনী ও অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছেছেন এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে তাদের ভূমিকা ছিল নগণ্য। রদ্রিগুয়েজ ৪ হাজার কর্মী মোতায়েনের দাবি করলেও প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ভূমিকম্পের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা পুলিশ বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।

উদ্ধার অভিযানের শুরুর দিকে সাধারণ মানুষই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে প্রথম দুই দিন স্থানীয় বাসিন্দারাই খাবারসহ ত্রাণ সরবরাহ করেন এবং সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ও মৃতদের বের করে আনেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী ও অল্পসংখ্যক সেনাসদস্য। ওই সেনাসদস্যরা রয়টার্সকে জানান, ওপর মহল থেকে সরাসরি কোনো আদেশ না পাওয়ায় তারা নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছিলেন।

সামরিক কর্মকর্তারা জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ও কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে নির্দেশনা না আসায় তারা সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেননি। একজন কর্মরত সেনাসদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমরা সরাসরি আদেশের অপেক্ষায় ছিলাম। কোনো নির্দেশনা ছাড়া আমি আমার ইউনিট নিয়ে উদ্ধারকাজে যেতে পারি না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভেনিজুয়েলার সামরিক সক্ষমতাও কমেছে। সেনাবাহিনীর বাজেটের সিংহভাগই বেতন দিতে ব্যয় করা হয়, ফলে সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন যন্ত্রপাতি কেনা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার ইউনিটে পর্যাপ্ত যানবাহন ও হেলিকপ্টারের অভাব ছিল। এমনকি হাতুড়ি ও কোদালের মতো সাধারণ সরঞ্জামেরও সংকট দেখা দিয়েছিল।

রদ্রিগুয়েজ উদ্ধারকাজে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘সংবাদমাধ্যমগুলোর অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন। তিনি ন্যাশনাল গার্ড কমান্ডার হুয়ান সুলবারান কিনতেরোকে উদ্ধার তৎপরতা তদারকির দায়িত্ব দেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেন। তবে একাধিক সূত্রের দাবি, একাধিক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ায় ক্ষমতার রেষারেষি তৈরি হয় এবং কারা অভিযান পরিচালনা করবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো পৌঁছানোর পরও তাদের কাজে লাগাতে দেরি হয়, যা অনেক প্রাণের বিনিময়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে।

এএম