গতকাল (বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই) হোয়াইট হাউস থেকে দেয়া এই ভাষণে ট্রাম্প ভোট জালিয়াতি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের ভিত্তিহীন দাবিগুলো আবারও তুলে ধরেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে হেরে যাওয়ার পর থেকে বারবার এই দাবি করে আসছেন তিনি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের তিন মাস আগে দেয়া আধা ঘণ্টার এই ভাষণে ট্রাম্প জানান, তিনি কয়েকশ গোয়েন্দা নথি অবমুক্ত করেছেন, যা বাইডেনের পক্ষে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার বেইজিংয়ের চেষ্টা সম্পর্কে তার দাবির সমর্থনে রয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর আগেই নিশ্চিত করেছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে চীন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।
ভাষণের সময় ট্রাম্পের পাশে তার শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন সহযোগী উপস্থিত ছিলেন। তবে সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়নি। বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, চীন ব্যক্তিগত তথ্যসহ ২২ কোটি ভোটারের ফাইল ‘অবৈধভাবে সংগ্রহ’ করেছে। ট্রাম্প বলেন, ১৮টি অঙ্গরাজ্যের ভোটার তথ্য চীন ‘কিনেছে, চুরি করেছে বা হ্যাক করেছে’। যারা এই বিষয়ে ‘সতর্কবার্তা দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন’, তারা এই তথ্য সরকারি কর্মকর্তা বা কংগ্রেসকে জানাননি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তবে চীন সংগৃহীত এসব তথ্য ভোট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বা নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে ব্যবহার করেছে—এমন কোনো প্রমাণ ট্রাম্প উপস্থাপন করেননি। তার এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস রয়টার্সকে জানিয়েছে, বেইজিং ‘কখনোই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না’। এ বিষয়ে বিবিসি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করছেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ট্রাম্পের বাকি প্রেসিডেন্ট মেয়াদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ঠিক হবে। সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘স্পষ্ট করে বলা যাক আমেরিকায় ভোটাররা তাদের নেতা নির্বাচন করেন, নেতারা ভোটার নির্বাচন করেন না।’
আরও পড়ুন:
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি মার্কিন ভোটার যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো বাধা বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে তাদের ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটরা প্রাণপণ লড়াই করবে।’ প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার আগের মূল্যায়নগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে ‘উচ্চ আস্থার’ সঙ্গে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা মূল্যায়ন করছি যে, চীন হস্তক্ষেপের কোনো প্রচেষ্টা চালায়নি এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল বদলে দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বিবেচনা করলেও তা বাস্তবায়ন করেনি।’ এর কারণ হিসেবে বলা হয়, চীন সম্ভবত ‘দুটি নির্বাচনি ফলাফলের কোনোটিকেই এতটা লাভজনক মনে করেনি যে, ধরা পড়লে ঝুঁকি নিতে হবে।’
ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের নতুন এক জরিপ প্রকাশের পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এই ভাষণ দেন। ওই জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তা কমে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে অনেক ভোটার হতাশ। ভাষণের অন্যত্র প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, মার্কিন ভোটদান যন্ত্রগুলো রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো বিদেশি প্রতিপক্ষের হস্তক্ষেপের প্রতি ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় রয়েছে।
মার্কিন নির্বাচনি অবকাঠামোর দুর্বলতাগুলো ভালোভাবেই নথিভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সমস্যা ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর সমাধান করা হয়, যে নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হন। সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছিল, রাশিয়া হ্যাকিং, সামাজিক মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার এবং প্রচারণায় অর্থায়নসহ একটি সমন্বিত নির্বাচনি হস্তক্ষেপ চালিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
ভাষণে ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন, মিশিগানে রাজ্য পর্যায়ের একটি তদন্তে ডেমোক্র্যাট সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীর ভোটার নিবন্ধন জালিয়াতির চক্র ধরা পড়েছিল। তবে এফবিআই তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যবস্থা নিতে বাধা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল পে, প্লে অ্যান্ড চিট (অর্থ দাও, খেলো ও প্রতারণা করো)।’ তবে ভোট বা গণনায় পরিবর্তন এসেছে অথবা ভোটদান যন্ত্র হ্যাক হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তিনি হাজির করতে পারেননি।
আলাদা এক দাবিতে ট্রাম্প জানান, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ শনাক্ত করেছে যে, ২ লাখ ৭৮ হাজার অ-নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে কেউ ভোট দিয়েছেন কি না, কিংবা কোনো নির্বাচনের ফলে প্রভাব ফেলেছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। ভাষণের শেষে ট্রাম্প আবারও ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাসের আহ্বান জানান। এই আইনে বেশির ভাগ ডাক ভোট নিষিদ্ধ করা, ভোটার নিবন্ধনের জন্য নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ভোট দেয়ার জন্য ছবিসংবলিত পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
এই আইনটি কয়েক মাস ধরে সিনেটে আটকে রয়েছে। ট্রাম্প মার্কিনিদের কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের কাছে এই আইন পাসের বিষয়ে চাপ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রিপাবলিকানরা সিনেটের দীর্ঘদিনের কার্যপ্রণালি ছাড়তে রাজি না হলে এই প্রচেষ্টা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে। এই ভাষণ ডেমোক্র্যাটদের উদ্বেগ প্রশমনে খুব একটা কাজ করবে না বলেই মনে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্প আসন্ন মধ্যবর্তী ও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য শুরুর কিছুক্ষণ আগে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এক্সে লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট আপনাদের ক্ষমতাকে ভয় পান এবং তিনি চান আপনারা বিশ্বাস করুন, আপনাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই।’ তিনি আরও লেখেন, ‘তিনি চান আপনারা আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলুন, যাতে আপনারা এই নভেম্বরে ঘরে বসে থাকেন। তিনি জানেন, মার্কিন জনগণ কতটা অসন্তুষ্ট, তাই তিনি নিশ্চিত করতে চান যে আপনারা যেন ভোট না দেন।’




