অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগুয়েজ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাব এই তেল উৎপাদনকারী দেশে ইতোমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে এবং বছর শেষ হওয়ার আগেই এটি খরা ডেকে আনতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বাড়িয়ে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন বদলে দেয়া এই ঘটনার কারণেই বিদ্যুৎ ও পানি সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়েছে বলে তিনি জানান।
ইতোমধ্যেই ধুঁকতে থাকা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ প্রয়োগের এই ঘোষণার পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এসব এলাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দৈনিক ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়ছে। যন্ত্রপাতির ঘন ঘন ত্রুটির কারণে কয়েক দিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং অনিয়মিত পানি সরবরাহও এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ভ্যালেন্সিয়ার ৭৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মারিয়েলা নুনেজ বলেন, ‘বিদ্যুৎই যেখানে থাকে না, সেখানে আরও কীভাবে সাশ্রয় করব সেটা মাথায় ঢুকছে না। কোনো ঘোষণা ছাড়াই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। গরমে ঘুমানো যায় না, আর লিফট না থাকায় ১২ তলার ফ্ল্যাটে হেঁটে ওঠানামা করতে হয়।’
বিদ্যুৎ ঘাটতির চিত্র
ভেনেজুয়েলায় স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সচল আছে ১৩ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। ফলে বর্তমান সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ঘাটতি রয়েছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি, যা আরও বাড়তে না দেয়ার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নেলসন হার্নান্দেজ চলতি বছরের শুরুতে এক প্রতিবেদনে জানান, বছরের পর বছর বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কারণে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র অচল। এতে জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেড়ে ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে; এর মধ্যে বেশির ভাগই আসে দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরি বাঁধ থেকে। রদ্রিগুয়েজ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বছর শেষ হওয়ার আগে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা হবে। সম্প্রতি জিই ভার্নোভা ও ইএমপিএসএর সঙ্গে নতুন টারবাইন সংস্কার ও কেনার চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বাড়বে বলেও জানান তিনি। তবে অতীতে সরকারের একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনায় অনেকেই এসব প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে পারছেন না।
জুলিয়া রাজ্যের প্রকৌশলী কেন্দ্রের প্রধান হোসে অ্যান্তোনিও রোবলেস বলেন, ‘সৎভাবে বলতে হবে, জনসেবা খাতের সংকটের জন্য এল নিনো দায়ী নয়। এটি কেবল দীর্ঘদিনের ঘাটতিকে আরও তীব্র করছে।’ তিনি এই সংকটের জন্য বছরের পর বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং সঞ্চালন ও বণ্টন লাইনের অবনতিকে দায়ী করেছেন। ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির পুরকৌশল বিভাগের প্রধান আব্রাহাম সালসেদো বলেন, খরা ও দাবানল কৃষিতে আরও বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। ভেনেজুয়েলার তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ সংস্থা কর্পোইলেক এ বিষয়ে জানতে চেয়ে পাঠানো কোনো অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ভূমিকম্পের ধাক্কার মধ্যেই বিদ্যুৎ সংকট
রাজধানী কারাকাসে গত সপ্তাহে সরকার অফিস ভবন ও শপিং মলগুলোকে দিনে তিন ঘণ্টা লিফট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। কিছু মন্ত্রণালয় ও সরকারি অফিসের সেবা কমিয়ে সপ্তাহে তিন দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, দুর্বল সেবার কবলে থাকা কিংবা ভূমিকম্পের ধকল সামলে ওঠার চেষ্টা করা কারখানা, দোকান ও কৃষিখামারগুলো সরবরাহ আরও সংকুচিত হলে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আয় ক্ষতির আশঙ্কা করছে। নার্স ও চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, কিছু সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিক জেনারেটর দিয়ে জরুরি সেবা চালু রাখার চেষ্টা করছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে আক্রান্ত শিল্পসমৃদ্ধ কারাবোবো অঞ্চলের বাণিজ্য চেম্বারের প্রধান এর্নেস্তো আব্বাস প্রশ্ন তুলেছেন, ‘জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার নিয়ে যদি নিশ্চয়তা না থাকে, তবে কীভাবে কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করবে? কীভাবেই বা তারা বেড়ে উঠবে?’
জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে উত্তর উপকূলের লা গুয়াইরাও রয়েছে। সেখানকার অনেক পরিবার সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের বাইরে তাঁবু গেড়ে বসবাস করছে। তারা জানিয়েছে, নতুন কোনো দুর্ভোগ আর সহ্য করার মতো অবস্থায় নেই তারা। মেয়ের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে তাঁবু গেড়ে পাহারা দিতে থাকা ৫৯ বছর বয়সী সাবেক সরকারি কর্মচারী হোসেফিনা রদ্রিগুয়েজ বলেন, ‘আমি জানি না আমরা কী করব।’ তিনি এখন অপেক্ষা করছেন সরকারি ঘোষণার জন্য—তার মেয়ের অ্যাপার্টমেন্টটি সংস্কার করা হবে নাকি ভেঙে ফেলা হবে। কোনো পানি না থাকায় এবং বাল্ব ও ফ্যান চালানোর জন্য পাশের ভবন থেকে তার নিয়ে আসায় নতুন এই রেশনিং তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
লা গুয়াইরার তানাগুয়ারেনা এলাকায় বহু ভবন ধসে গেছে এবং উদ্ধারকর্মীরা এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ বের করছেন। গৃহহীন পরিবারগুলো এখন গোসল ও কাপড় ধোয়ার জন্য কেবল ছোট্ট একটি নদীর ওপর ভরসা করছে, যেটি সৈকতে গিয়ে মিশেছে, যেখানে ট্রাকগুলো ধ্বংসস্তূপ ফেলছে।





