বার্গেনস্টক বৈঠক: আলোচনার টেবিলে ভ্যান্স-কুশনারে সঙ্গে গালিবাফ-আরাঘচি

সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে
সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে | ছবি: রয়টার্স
0

সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে একটি বিলাসবহুল হোটেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আজ (রোববার, ২১ জুন) টেকনিক্যাল আলোচনা শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সই হওয়া চুক্তির স্থায়িত্ব লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। ইরানের দাবি, চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ রয়েছে এবং ইসরাইলি হামলা এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

রোববারের এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন পাকিস্তান ও কাতারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। এছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জেরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পরপরই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গতকাল (শনিবার, ২০ জুন) আলোচনার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার আগে জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, তিনি পরমাণু কর্মসূচি ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে অগ্রগতি অর্জন করতে পারবেন বলে আশা করছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিদল চুক্তিতে উল্লেখিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেবে। আজ (রোববার, ২১ জুন) আলোচনার আগে তিনি জানান, বার্গেনস্টকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চতুর্পক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী লেবাননে তাদের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে চলেছে। আজকের আলোচনায় এটিই প্রধান বিষয় হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই কারিগরি আলোচনা ৬০ দিন ধরে চলবে। এখানে শান্তি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায় এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধের মতো প্রধান বাধাগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান ছাড়ার আগে গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেছেন, কারিগরি আলোচনা শুরু করার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। ইরান মূলত লেবাননে হামলা বন্ধ, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান কেবল কাগজের কোনো চুক্তি মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা অর্থনীতি ও লাভ-ক্ষতির ভাষা ভালো বোঝে। চুক্তি যদি শুধু কাগজে থেকে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যাবে।’

প্রথম দিনের আলোচনায় লেবানন ইস্যুটিই প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও শনিবার লেবাননে ইসরাইলি বাহিনী বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে। আল-জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ ভ্যাল জানান, ইসরাইল চুক্তি মেনে না চলা পর্যন্ত ইরান এর বাস্তবায়নে এগোবে না। চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষ লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এতে ইসরাইলের কথা উল্লেখ নেই, যারা লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে আছে এবং গত মার্চের শুরু থেকে হামলায় ৪ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। ইরানের মতে, ইসরাইল যেন চুক্তি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসন বলেন, পরমাণু ইস্যুর মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনায় যাওয়ার আগে উভয় পক্ষই প্রথম পর্যায়ের চুক্তি সফল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। তিনি বলেন, ‘ইসরাইল এই চুক্তিতে সই করেনি, তাই তাত্ত্বিকভাবে তারা এটি মানতে বাধ্য নয়। ফলে ইসরাইল যুদ্ধবিরতি না মানলে এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই চুক্তি ভঙ্গের সামিল হবে।’

কারিগরি আলোচনা শুরু হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি একটি প্রধান বিষয় হবে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়েছে, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা এর সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না। বিপরীতে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, তাদের কর্মসূচি বেসামরিক কাজের জন্য এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে তারা পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করতে আলোচনায় বসতে রাজি আছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা এখনো কাটেনি। শনিবার ইরান এটি বন্ধের ঘোষণা দিলেও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, জলপথটি সচল রয়েছে এবং শনিবারও ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে ওই পথ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে এবং এরপর হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল নেয়া হবে না, যদি না যুক্তরাষ্ট্র সেটি আরোপ করে। এই প্রণালি বন্ধ এবং ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ-অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ অবসানের সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।

এএম