ইরান যুদ্ধ: মার্কিন স্বার্থ ও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাচ্ছেন ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: সংগৃহীত
0

১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে সরে আসে। টানা তৃতীয় রাত ইরানে হামলার ঘোষণা দিয়েও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ইরানি সামরিক বাহিনী সতর্ক করেছিল, হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘আগের চেয়ে আরও কঠোর জবাব’ পাবে। ট্রাম্প পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, দুই দেশের আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় তিনি হামলা বাতিল করেছেন। তার ভাষায়, ‘আলোচনার বিষয়বস্তু ও চূড়ান্ত পয়েন্টগুলো ধারণাগত ও বিস্তারিতভাবে অনুমোদিত হয়েছে।’ যদিও তেহরান বলেছে, এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। দ্য কনভারসেশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য বিস্তারিত উঠে এসেছে।

প্রস্তাবিত সমঝোতাটি আসলে একটি সমঝোতা স্মারক, যা ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণ করবে। এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও পরমাণু ইস্যুর মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে। ফলে এটি কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়। এর আগেও একাধিকবার ট্রাম্প চুক্তি আসন্ন বলে ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক অগ্রগতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাস্তবতা—পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফেরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ছিল না। সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লজউইটজের ভাষায়, যুদ্ধ তখনই যৌক্তিক যখন এর পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও বাস্তবসম্মত কৌশল থাকে। ইরানের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের এমন কোনো পরিষ্কার রূপরেখা দৃশ্যমান ছিল না। ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা, কিন্তু সে লক্ষ্যে সামরিক বিজয়ের কোনো সংজ্ঞা বা রূপরেখা তিনি দেননি।

শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, তেহরানের শাসনব্যবস্থা ভঙ্গুর এবং শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে দ্রুত পতন ঘটতে পারে। কিন্তু সেই অনুমান বাস্তবে মেলেনি। বরং কয়েক সপ্তাহের বোমা হামলা ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রকে ভেঙে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–নিয়ন্ত্রিত বর্তমান কাঠামো একটি ‘রাষ্ট্রসমর্থিত মিলিশিয়া’ হিসেবে কাজ করে, যা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আঘাত সহ্য করে টিকে থাকতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে এমন কাঠামো দ্রুত ভেঙে ফেলা কঠিন।

এছাড়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ার আশঙ্কা ছিল। ইরান তাদের মিত্র হুতিদের মাধ্যমে ইয়েমেন ও আফ্রিকার শিং অঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব প্রণালি অচল করে দিতে পারে। এই পথটি সৌদি তেল ও উপসাগরীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট। হরমুজ প্রণালি আগে থেকেই বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারতো। একই সঙ্গে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে সরাসরি ইরানি হামলা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার ঝুঁকি ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ে। প্রতিটি ইরানি পাল্টা হামলা উপসাগরীয় মিত্রদের মনে এই প্রশ্ন জাগায়—মার্কিন উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি উল্টো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বও চাপের মুখে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা ট্রাম্পকে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একটি সমঝোতা স্মারক তাকে যুদ্ধ থেকে ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ বা রাজনৈতিক ‘অফ-র‍্যাম্প’ দিতে পারে, যা তিনি নিজস্ব ভাষ্যে ‘বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

এএম