‘রুশ দাভোস’-এ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই মেরুতে রাশিয়া; পুতিনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন | ছবি: রয়টার্স
0

ইউক্রেন যুদ্ধ যখন কোনো বিরতি ছাড়াই চলছে, তখন নিজের বার্ষিক প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলনে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী রূপরেখার মুখোমুখি হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামে অংশ নেয়া একদল মনে করছেন, রাশিয়ার উচিত লড়াই চালিয়ে যাওয়া এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হওয়া। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, একটি অংশ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকটি তুলে ধরে দ্রুত এটি বন্ধের সুফল নিয়ে কথা বলছেন। গতকাল (বুধবার, ৩ জুন) ইউক্রেনীয় ড্রোন সেন্ট পিটার্সবার্গের তেলের টার্মিনাল ও নৌঘাঁটিতে আঘাত হানলে যুদ্ধের আঁচ এই সম্মেলনের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। শহরের আকাশে উড়তে থাকা ধোঁয়ার কুণ্ডলী রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই।

৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে ক্রেমলিনের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের বিপরীতমুখী মতামতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে আছেন। বর্তমানে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের রুশ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় একদল ‘অভিজাত’ মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় দ্রুত শান্তি চুক্তি করা উচিত। কিন্তু কট্টর জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ আসলে পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক সংঘাতের প্রথম ধাপ মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে ছদ্মবেশে থাকার সময় এফবিআইয়ের হাতে ধরা পড়া সাবেক রুশ গোয়েন্দা আন্দ্রেই বেজরুকভ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে আগামী কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশক আমাদের যুদ্ধের মধ্যে থাকতে হবে। এটি সরাসরি বড় যুদ্ধ হতে পারে অথবা ধীরগতির কোনো সংঘাত হতে পারে। আমাদের এই যুদ্ধের সঙ্গেই বাঁচতে শিখতে হবে।’ তার এই বক্তব্যে হল ভর্তি দর্শক হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান।

জাতীয়তাবাদীদের মতে, ক্রমবর্ধমান বিপজ্জনক বিশ্বে রাশিয়াকে হয় নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে, নতুবা ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে। সম্মেলনে অস্ত্র ও ড্রোনের প্রদর্শনী যেমন হয়েছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন সাইবার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামও গুরুত্ব পেয়েছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আক্রমণ শুরুর পর ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চলতি বছর রণক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা ধীর হয়ে গেছে। ডনবাস অঞ্চলের ৯০ শতাংশের বেশি দখল করলেও বাকি অংশটুকু কবজায় নিতে পারছে না মস্কো। কিয়েভও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের ভূমি থেকে পিছিয়ে যাবে না এবং রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব মেনে নিবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা থমকে থাকায় ক্রেমলিনের কর্মকর্তাদের ধারণা, ওয়াশিংটন এখন ইরানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ নিয়ে বেশি ব্যস্ত। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) এখন এদিকে কম মনোযোগ দিচ্ছে।’

পুতিনকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম কিরিল দিমিত্রিভ শান্তি চুক্তির অর্থনৈতিক সুফলের কথা তুলে ধরেছেন। তবে সম্মেলনে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রয়টার্সকে বলেন, ‘প্রশ্ন হলো এই যুদ্ধ কি শেষ হবে নাকি আমরা আরও কঠিন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?’

চরম জাতীয়তাবাদী আদর্শিক গুরু আলেকজান্ডার দুগিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই যুদ্ধ হয় রাশিয়ার জয়ের মাধ্যমে শেষ হবে, নতুবা এটি কখনোই শেষ হবে না। আমাদের এখন সব শক্তি আর ইচ্ছা এক করতে হবে। আমরা একটি শান্তিকামী দেশ যে ছুটির দিনে পিকনিক করতে যায়—এমন ভান করা বন্ধ করতে হবে।’ আগামী বছরগুলোতে পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের পরিণতি কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করেন: ‘যুদ্ধ’।


এএম