দিল্লিতে মোদি-রুবিও বৈঠক: আলোচনার কেন্দ্রে ইরান সংকট ও মার্কিন জ্বালানি

নরেন্দ্র মোদি ও মার্কো রুবিও
নরেন্দ্র মোদি ও মার্কো রুবিও | ছবি: সংগৃহীত
0

চার দিনের সফরে ভারতে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, বৈঠককালে মোদিকে হোয়াইট হাউস সফরের আমন্ত্রণ জানান রুবিও। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি জানান, তাদের মধ্যে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হলো; যার বড় প্রভাব পড়েছে ভারতের ওপর। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভঙ্গুর শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইরান এই পথ বন্ধের কৌশল নিয়েছে। এর ফলে ৮১ শতাংশেরও বেশি জ্বালানি আমদানিনির্ভর ভারত তীব্র সংকটে পড়েছে; কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্ধেকই আসে এই পথ দিয়ে।

বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র জানান, রুবিও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে মোদির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ইরান যাতে জিম্মি করতে না পারে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান নেবে। পাশাপাশি ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে মার্কিন জ্বালানি পণ্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে। ভারত যত ইচ্ছা মার্কিন জ্বালানি কিনতে চাইলে তা সরবরাহ করতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত বলে সফরের আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন রুবিও।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ালে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর করতে সাহায্য করতে পারে। ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৮২০ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জ্বালানি আনা ভারতের জন্য সহজ নয়; কারণ এই নৌপথ অনেক দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন জ্বালানি দিয়ে ভারতের বর্তমান ঘাটতি পূরণ করা যৌক্তিক হবে না।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির মার্কিন স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিনীত প্রকাশ বলেন, ‘এই সফরের মূল বিষয় জ্বালানি নিরাপত্তা; কারণ ইরান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হচ্ছে না।’ রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে ভারতকে ছাড় দিয়েছে, তবে দিল্লি আরও কিছু সুবিধা চাইতে পারে।

বাণিজ্যিক আলোচনা নিয়ে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের অবসান কে ঘটিয়েছেন—তা নিয়ে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী দাবির ছায়াও রয়েছে এই সফরে। ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে শান্তি ফিরিয়েছেন, তবে নয়া দিল্লি তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার নীতি প্রত্যাখ্যান করে এই দাবি অস্বীকার করেছে। এছাড়া পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা দিল্লির অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন:

অবশ্য গত কয়েক মাসে ওয়াশিংটন ও দিল্লি একে অপরের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপও নিয়েছে। ১০ মাসের অচলাবস্থার পর চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প ভারতের ওপর পারস্পরিক শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনেন। পরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর তা ১০ শতাংশে নেমে আসে, যা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের স্বস্তি দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তিতে ভারত জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যসহ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর এই শুল্ক কমানো হয়। বর্তমানে দুই পক্ষ একটি বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির চূড়ান্ত পাঠ নিয়ে আলোচনা করছে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই বিশাল অঙ্কের বিষয়ে সতর্ক। কারণ ভারতের বর্তমান মার্কিন বাণিজ্য এই ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ভগ্নাংশ মাত্র। ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানি টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে তার কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের শোধনাগার নির্মাণে ট্রাম্পের ঘোষণা নিয়ে পুরোপুরি নীরব রয়েছেন।

অনিশ্চয়তার মধ্যেও ২০২৬ সালের মার্চে সমাপ্ত বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি ৮ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারে স্থিতিশীল ছিল। গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব জানান, ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে উচ্চ শুল্ক থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি বার্ষিক ভিত্তিতে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। শুল্ক কমানোর পর এপ্রিল মাসে ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ক্রিসিল রিসার্চ জানিয়েছে, এটি শুল্ক হ্রাসের ইতিবাচক প্রভাব, তবে শুল্কের স্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় রপ্তানির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত তার বাণিজ্য নীতি কিছুটা উদার করতে বাধ্য হয়েছে। দেশটি যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ওমানের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করেছে। এইচএসবিসির প্রাঞ্জল ভান্ডারি বলেন, ট্রাম্প মার্কিন পণ্যের ওপর সব শুল্ক প্রত্যাহারের কথা বললেও এসব চুক্তি নির্দিষ্ট কিছু খাতকে সুরক্ষার কাঠামো দেয়। ফলে মার্কিন কোম্পানির জন্য বাজার উন্মুক্ত হলেও কৃষি ও দুগ্ধ খাতের মতো সংবেদনশীল খাতগুলো সুরক্ষিতই থাকবে।

বাণিজ্যের বাইরে ইরান যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কী হয়, তা দেখার বিষয়। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কূটনীতির বাইরে ভারত সামরিক কোনো ভূমিকা নিতে রাজি নয়। এই সংকটাপন্ন জলপথে সামরিক সম্পদ মোতায়েনের জন্য ট্রাম্পের আহ্বান দিল্লি বরাবরই নাকচ করে এসেছে।

পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছে কোয়াড জোটের ভবিষ্যৎ। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প কোয়াডকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখলেও বর্তমানে তার অবস্থান কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। আগামী ২৬ মে দিল্লিতে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেবেন রুবিও। চলতি বছরের শেষের দিকে দিল্লিতে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও ট্রাম্প এতে অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিনীত প্রকাশ মনে করেন, চীনকে সহজে দমানো যাবে না বুঝতে পেরেই ট্রাম্প কোয়াডের ক্ষেত্রে ভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। গত বছর ট্রাম্পের ঠান্ডা প্রতিক্রিয়ার কারণে কোয়াড প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এই জোটকে কতটা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, তা দেখার বিষয়। আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের কাছে কোয়াডের গুরুত্ব এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এএম