রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমদানি শুল্ক এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় আঘাত হেনেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
২০১৮ সালে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে প্রথম এবং ২০২২ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় ভারত-নরডিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোর, ডেনমার্কের মেতে ফ্রেডেরিকসেন, ফিনল্যান্ডের পেত্তেরি অরপো, আইসল্যান্ডের ক্রিস্ট্রুন ফ্রস্তাদোত্তির এবং সুইডেনের উলফ ক্রিস্টারসন অংশ নিচ্ছেন। ১৯৮৩ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পর ৪৩ বছরের মধ্যে নরওয়ে সফরকারী প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদি।
সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক ইস্যু—বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই সম্মেলন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর, ব্লু ইকোনমি, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও আর্কটিক অঞ্চলে দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও কৌশলগত মাত্রা দেবে।
বিশেষ করে নরডিক দেশগুলো থেকে সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ভারত থেকে ওষুধ ও টেক্সটাইলের মতো পণ্য রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ২০২৪ সালে নরডিক দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সমন্বিত বাণিজ্য ছিল ১৯ বিলিয়ন (১ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের জ্যেষ্ঠ ফেলো গরিমা মোহন আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সংকটের কারণে ইউরোপ ও ভারত উভয়েই অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। ফলে মোদির এই সফরে সবুজ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা বেশ গুরুত্ব পাবে।
আরও পড়ুন:
সম্মেলনে আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলেও ভারতের পদচারণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ভারত কোনো আর্কটিক দেশের সঙ্গে সীমানা ভাগ না করলেও ১৯২০ সাল থেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ওই অঞ্চলে যুক্ত রয়েছে। সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সেখানে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সেখানে একটি 'ভারত-নরডিক আর্কটিক মেকানিজম' প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিশেষ করে চীন যখন ‘পোলার সিল্ক রোড’-এর মাধ্যমে সেখানে প্রভাব বাড়াতে চাইছে, তখন ভারতও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে মরিয়া।
এই সম্মেলনে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। নরডিক দেশগুলো রাশিয়ার কট্টর সমালোচক হলেও ভারতের সঙ্গে মস্কোর পুরোনো ও মজবুত কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত সরাসরি রাশিয়ার নিন্দা করা থেকে বিরত থেকেছে, বরং ছাড়কৃত মূল্যে সেখান থেকে বেশি করে তেল কিনেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসালে ভারত তাদের জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।
সম্মেলনের আগে নরেন্দ্র মোদি ১৮ মে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন, যেখানে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে’ উন্নীত করা হয়। এর আগে ১৭-১৮ মে সুইডেনের গোথেনবার্গে ইউরোপীয় সিইওদের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেন।
১৫-১৭ মে নেদারল্যান্ডস সফরেও ভারতের টাটা ইলেকট্রনিকস ডাচ্ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী সে দেশে ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, যার জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সিবি জর্জ বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বোঝাপড়ার অভাব থেকেই এমন প্রশ্ন ওঠে। নরডিক সম্মেলন শেষে ইতালির রোমে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সঙ্গেও মোদির বৈঠক করার কথা রয়েছে।




