গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। এর জেরে চলতি মাসে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স থেকে আমিরাতকে সরাসরি সতর্ক করা হয়। রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন এই যৌথ কমান্ড আমিরাতের নেতাদের উদ্দেশে বলেছে, ‘ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে বেইমানি করে দেশটিকে যেন ‘‘মার্কিন ও ইহুদিবাদী এবং তাদের সামরিক বাহিনীর আস্তানায়’’ পরিণত করা না হয়।’
আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গভীর সামরিক, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে বলে দাবি করেছে রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ ও বন্দরগুলোতে কোনো হামলা হলে ‘চূর্ণবিচূর্ণ ও অনুশোচনামূলক জবাব’ দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
এমনকি রেভল্যুশনারি গার্ড ঘোষণা করেছে, আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ বন্দরটি হরমুজ প্রণালির এমন এক এলাকায় অবস্থিত, যার ওপর ইরানের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে এই বন্দরে যাতায়াতকারী যেকোনো জাহাজ ইরানের আওতাভুক্ত। চলতি মাসের শুরুতে বন্দরটিতে হামলার ঘটনা ঘটলেও ইরান এর দায় অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে আমিরাত বারবার ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং সামরিক উপায়ে এর জবাব দেয়ার অধিকার রাখে বলে জানিয়েছে। তারা দেশটিতে বসবাসরত ইরানিদের ভিসা বাতিল করেছে এবং ইরানি ব্যবসা, বাণিজ্য পথ ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ইরান বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।
কারণ, চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ইরান মূলত আমিরাতের বন্দরগুলো ব্যবহার করতো। মার্কিন নৌ অবরোধ এবং এর জেরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ইরান এখন আমিরাতের বদলে পাকিস্তান, ইরাক ও তুরস্কের মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইরান কেন আমিরাতকে প্রধান নিশানা বানিয়েছে, তার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। আবু ধাবির কাছে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার পাশাপাশি অত্যাধুনিক রাডার ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম রয়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, যুদ্ধের সময় তারা এসব সরঞ্জাম নিশানা করেছিল। এছাড়া ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তিতে সই করে আমিরাত। এরপর থেকে ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে।
চলমান যুদ্ধে ইসরাইল তাদের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এটি পরিচালনার জন্য সেনাসদস্য আমিরাতে পাঠিয়েছে, যা আরব বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায়নি। গত মঙ্গলবার তেল আবিবে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, এই উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিতে আমিরাত ও ইসরাইলের অসাধারণ সম্পর্কের ফসল।
আমিরাত মনে করে, তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক একটি সম্পূর্ণ ‘সার্বভৌম বিষয়’। তবে গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব এবং আবু মুসা নামের তিনটি দ্বীপ নিয়ে ১৯৭১ সাল থেকে ইরানের সঙ্গে আমিরাতের বিরোধ রয়েছে, যা এই উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
চলমান সংঘাতে আমিরাত সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছে কি না, তা নিয়েও নানা জল্পনা রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহখানেক পর ইসরাইলি গণমাধ্যম দাবি করে, আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের কেশম দ্বীপে একটি পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। আমিরাত এই খবরকে ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিলেও তেহরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে। ধারণা করা হয়, বাহরাইনের জুফায়ের মার্কিন ঘাঁটি থেকে এই হামলা চালানো হয়েছিল। এর জবাবে রেভল্যুশনারি গার্ড সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
গত এপ্রিলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি একটি ভূপাতিত চীনা ‘উইং লুং’ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ দেখায়। ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে আমিরাত এই ড্রোন ব্যবহার করেছিল। ৮ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইরানের ল্যাভান তেল শোধনাগারে হামলা ও সিরি দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর আসে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। এরপর রেভল্যুশনারি গার্ডের টেলিগ্রাম চ্যানেলে আমিরাতের ব্যবহৃত ফরাসি ‘মিরাজ ২০০০-৯’ যুদ্ধবিমানের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। দাবি করা হয়, বিমানটি দক্ষিণ ইরানের ওপর দিয়ে উড়ছিল।
গত মাসের শেষ দিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে বহনকারী বিমানকে এসকর্ট করে নিয়ে যায় আমিরাতের ‘এফ-১৬ই’ যুদ্ধবিমান। ওই বিমানের গায়ে দেশের নাম ও নম্বর মুছে ফেলা ছিল। ইরানের বিশ্লেষকরা দাবি করেন, ইরানে হামলায় অংশ নেয়ায় ঝুঁকি এড়াতে আমিরাত এই কৌশল নিয়েছিল।
এসব ঘটনার জেরে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। তবে ইসরাইলের বাইরে আমিরাতের ওপরই সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে ইরান। যদিও ইরানি ভূখণ্ডে হামলার বিষয়ে আমিরাত সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।





