পশ্চিমা বিশ্ব এখনো বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমে এটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন কোনো সামরিক জোট গড়ে উঠছে? অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, ন্যাটো ধাঁচের কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। কারণ এই চার দেশের হুমকি-বোঝাপড়ায় পার্থক্য রয়েছে এবং প্রত্যেকেরই অন্যান্য জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আছে।
তবে আনুষ্ঠানিক জোট ছাড়াও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একমেরু বিশ্বব্যবস্থা থেকে বহুমেরু বাস্তবতায় রূপান্তরের এই সময়ে মধ্যম শক্তিগুলো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে অংশীদারিত্বের পরিসর বাড়াচ্ছে। মতাদর্শগত বিভেদ পাশে রেখে তারা কৌশলগত সুযোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং বর্তমান ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত অবস্থান নিচ্ছে।
২০২১ সালের আগে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তুরস্ক প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও জোরদার করার পথে হাঁটছে। মধ্যস্থতার কূটনীতি জোরদার করার পাশাপাশি প্রয়োজনে কঠোর শক্তিও প্রয়োগ করেছে আঙ্কারা। সিরিয়া, লিবিয়া ও দক্ষিণ ককেশাসে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি তার উদাহরণ।
শুধু তুরস্কই নয়, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশ্বের পুলিশ’ ভূমিকা থেকে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিতের পর আঞ্চলিক মধ্যম শক্তিগুলো আরও সক্রিয় হয়েছে। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অক্ষের সংঘাত এবং গাজা, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরাইলের নীতি—সব মিলিয়ে পুরোনো শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ দুর্বল হওয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন:
ইরান যুদ্ধ এই চার দেশের দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংযোগ স্থাপনে সৌদি আরব ও তুরস্ক ভূমিকা রাখে। গাজা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় তুরস্ক ও মিসরের সমন্বয় বেড়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা ও ২০২৫ সালে কাতারে হামলার মতো ঘটনাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বুঝতে বাধ্য করেছে।
এই বাস্তবতায় চার দেশই আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের পথে এগোচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য একতরফাভাবে ইরান বা ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। পাকিস্তানও ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলো এই সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করেছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরব সমন্বিত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। তুরস্ক পাকিস্তানের নৌ ও বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণে সহায়তা করছে। সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা বাড়ছে। মিসর ও তুরস্ক ২০২১ সালের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। সৌদি আরব মিসরের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
এই চার দেশের সক্ষমতাও কম নয়। তুরস্ক ও সৌদি আরব জি-২০ সদস্য। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের রয়েছে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা। মিসর নিয়ন্ত্রণ করে সুয়েজ খাল—ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ করিডর। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছে, যা পারস্পরিক সমন্বয় বাড়িয়েছে।
যদিও অদূর ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের সম্ভাবনা কম, তবে এই চার দেশের সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে। প্রয়োজনভিত্তিক বৃহত্তর জোটও গড়ে উঠতে পারে। ২৩ এপ্রিল জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া ও কাতার এই চার দেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে জেরুজালেম ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের পদক্ষেপের নিন্দা জানায়—যা একটি বৃহত্তর সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন আঞ্চলিকীকরণের ধারা স্পষ্ট হচ্ছে, যেখানে মধ্যম শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।





