পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্সে লেখেন, ‘উভয় পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বোধের পরিচয় দিয়েছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্য এগিয়ে নিতে গঠনমূলকভাবে যুক্ত রয়েছে।’
ইরানও জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের এই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হতে দেবে। এতে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দামে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমবে। ইসরাইলও তার চিরশত্রু ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরান কীকে ‘সর্বাঙ্গীন চুক্তি’ মনে করছে, তা নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। শুক্রবার ইসলামাবাদে শুরু হতে পারে আলোচনায় বোঝা যাবে, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নিতে পারে কি না।
যুক্তরাষ্ট্র কী কী বিষয়ে রাজি
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে সামরিক হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটনের সব সামরিক লক্ষ্য ‘পূরণ’ হয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালির ‘সম্পূর্ণ, অবিলম্বে ও নিরাপদ’ খোলার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের জবাবে তেহরান কার্যত এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের কাছ থেকে ১০ দফা একটি প্রস্তাব এসেছে, যা তার ভাষায় আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি।’
তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘গত দিনের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে প্রায় সবগুলোরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে, তবে দুই সপ্তাহের সময়ে চুক্তি চূড়ান্ত ও কার্যকর করা যাবে।’
সিএনএনের কূটনৈতিক সম্পাদক জেমস বেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনায় রয়েছে—
১. যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগ্রাসন না করার মৌলিক প্রতিশ্রুতি
২. ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত চলাচল, অর্থাৎ জলপথটির ওপর ইরানের প্রভাব বজায় থাকা
৩. ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির স্বীকৃতি
৪. ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা এবং প্রস্তাব প্রত্যাহার
৫. আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে সব প্রস্তাব প্রত্যাহার
৬. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে সব প্রস্তাব প্রত্যাহার
৭. অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব কমব্যাট ফোর্স প্রত্যাহার
৮. যুদ্ধকালে ইরানের ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের অর্থ থেকে আদায় করা হবে
৯. বিদেশে জব্দ সব ইরানি সম্পদ ও সম্পত্তি ছেড়ে দেয়া
১০. এসব বিষয় বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা
তবে এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘যেকোনো শান্তিচুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ওটা পুরোপুরি নিষ্পত্তি করা হবে, নইলে আমি এ সমঝোতায় যেতাম না।’
ইরান বলছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না, তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।
পরে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফাঁস করা ১০ দফা প্রস্তাব আসলে আলোচনায় থাকা শর্তগুলোর সঙ্গে এক নয়।
তিনি বলেন, ‘ওগুলো খুবই ভালো পয়েন্ট—এবং এর বেশির ভাগই পুরোপুরি আলোচনায় এসেছে। ইরান যেভাবে বলছে, সেগুলো ততটা সর্বোচ্চ মাত্রার দাবি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন থেকে আলোচনায় যা হবে, তা যদি ভালো না হয়, আমরা খুব সহজেই আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারি।’
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও যুক্তরাষ্ট্র বা তার প্রশাসন ১০ দফা প্রস্তাবে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা বা অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার—এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।
আশ্চর্যের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কথাও উল্লেখ করেনি। অথচ ইরান ও ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার বড় অংশ ছিল এগুলো। এর আগে ওয়াশিংটন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত বা ব্যাপকভাবে ভেঙে ফেলতে বলেছিল। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বিষয় নয়।
ইরান কী কী বিষয়ে রাজি
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা বন্ধ হলে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিশোধমূলক হামলা স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে।
আরাঘচি এক্সে লেখেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীও তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ করবে।’
বুধবার ইরান-সমর্থিত ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও অঞ্চলে ‘শত্রু ঘাঁটি’তে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা বন্ধের ঘোষণা দেয়।
আরাঘচি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সমন্বয় করা হবে।’ তিনি আরও জানান, এ কার্যক্রম ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই চলবে।
এপি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ইরান ও ওমান ফি আদায় করতে পারবে। ওই ফি পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করা হবে বলে আঞ্চলিক এক অজ্ঞাত সূত্র জানিয়েছে।
ইসরাইল কী কী বিষয়ে রাজি
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিতে ইসরাইল সম্মতি দিলেও প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর বলেছে, এটি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে যুদ্ধ বা দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি অভিযানকে অন্তর্ভুক্ত করে না।
নেতানিয়াহুর মন্তব্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ তিনি বলেছিলেন যুদ্ধবিরতিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। ট্রাম্পের ঘোষণাতেও লেবাননের কথা ছিল না।
বুধবার সকালে ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর টাইর-এর কাছে একটি ভবন খালি করার নতুন নির্দেশ দেয়।
মার্চের ২ তারিখে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা শুরু করার পর লেবাননও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
হিজবুল্লাহ বলেছে, ফেব্রুয়ারি ২৮-এ যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে লেবাননে ইসরাইলের মেনে নেয়া যুদ্ধবিরতির নিয়মিত লঙ্ঘনের জবাবে তারা হামলা চালিয়েছে।
লেবাননের কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৪৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৭ জন স্বাস্থ্যকর্মী।
যুদ্ধবিরতির পর কী
পরবর্তী তাৎক্ষণিক ধাপ হলো ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হওয়া, যেখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক্সে লেখেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে এই বিচক্ষণ পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই এবং উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে তাদের প্রতিনিধিদলকে ১০ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যাতে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে বাকি বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি করা যায়।’
ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ত্রিটা পারসি বলেন, ‘ইসলামাবাদে সম্ভাব্য আলোচনা ব্যর্থও হতে পারে, তবে এখন মাঠ বদলে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের ব্যর্থ শক্তি প্রয়োগ মার্কিন সামরিক হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতিতে নতুন গতি এনেছে।’
‘ওয়াশিংটন এখনও গর্জাতে পারে। কিন্তু ব্যর্থ যুদ্ধের পর এ ধরনের হুমকি আর ততটা কার্যকর শোনায় না। যুক্তরাষ্ট্র আর শর্ত আরোপের অবস্থানে নেই; যেকোনো সমঝোতা এখন বাস্তব আপসের ওপরই দাঁড়াতে হবে।’





