যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা প্রথম শুরু হওয়ার পাঁচ সপ্তাহ পর এই হামলাগুলো হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন,‘ তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে সীমিত হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল (শুক্রবার, ৩ এপ্রিল) ইরান একটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। একজন সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে, আর দ্বিতীয়জনের খোঁজ এখনো চলছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও জানিয়েছে, ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে একটি মার্কিন এ-১০ ওয়ারথগ আক্রমণকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিধ্বংসী বিমান হামলার পরও দুর্বল হয়ে পড়া ইরানি সামরিক বাহিনী তবু এক কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই রয়ে গেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দৃশ্য সম্ভবত প্রচলিত রাডারভিত্তিক ট্র্যাকিংয়ের বদলে অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড (আইআর) সেন্সর দিয়ে ধারণ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোতে উচ্চ-কনট্রাস্ট ইমেজে দেখা যায়, যা সাধারণত ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল বা ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) ট্র্যাকিং সিস্টেমের ফিচার।
নির্ভুল মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় এর বেশির ভাগ রাডারনির্ভর ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, ইরান এখন সম্ভবত নিষ্ক্রিয় সেন্সরের ওপর বেশি নির্ভর করছে। এসব সেন্সর বিমান ইঞ্জিন ও বিমানের দেহের ঘর্ষণ থেকে উৎপন্ন তাপ-সংকেত শনাক্ত করে থাকে।
একটি ইনফ্রারেড ব্যবস্থা শীতল তাপ-সন্ধানী সেন্সর ব্যবহার করে জেট ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ শনাক্তের মাধ্যমে কোনো রাডার ছাড়াই একটি বিমানের ওপর নিশানা স্থির করে। অপারেটর উৎক্ষেপককে এমনভাবে নির্দেশনা দেন, যাতে সন্ধানী সেন্সর আকাশে বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী তাপ-সংকেতটি শনাক্ত করে। এরপর নিশানা স্থির হলে, ক্ষেপণাস্ত্র সঠিকভাবে চলমান তাপ-উৎসকে ফলো বা অনুসরণ করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের নিজস্ব মজিদ স্থল থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম কিছু হামলায় ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
মজিদ (এডি-০৮) হলো ইরানের নিজস্ব স্বল্পপাল্লার, স্বল্প উচ্চতায় ব্যবহৃত স্থল থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা দেশটির ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন ২০২১ তৈরি করে।
এটি মোবাইল আরাস-২ ৪x৪ কৌশলগত যানবাহনে বসানো থাকে এবং নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা বিমান, হেলিকপ্টার, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে পয়েন্ট ডিফেন্স সরবরাহ করে।
এই ব্যবস্থায় প্যাসিভ ইমেজিং ইনফ্রারেড হোমিং ও ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ট্র্যাকিং ব্যবহার করে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্য শনাক্ত করা যায়, ফলে গোপনীয়তা ও টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত হয়। প্রতিটি ৭৫ কেজি ওজনের এডি-০৮ ক্ষেপণাস্ত্র ৭০০ মিটার থেকে ৮ কিলোমিটার দূরত্বের এবং সর্বোচ্চ ৬ কিলোমিটার উচ্চতার যেকোনো থ্রেট মার্ক ২ গতিতে প্রতিহত করতে পারে। ধারণা করা হয়, এই ব্যবস্থা একসঙ্গে চারটি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক ও আঘাত হানতে সক্ষম, যা ইরানের স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে।
এফ-১৫ই বা এ-১০-এর মতো যুদ্ধবিমানকে ইনফ্রারেড/ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল (আইআর/ইও) সেন্সরে ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, এসব বিমানের গতি খুব বেশি, কৌশলগত গতিশীলতা চরম মাত্রার এবং উন্নত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। আইআর সন্ধানী সেন্সরকে অবশ্যই বিমানের ইঞ্জিনের তাপ বা বিমানের দেহের ঘর্ষণ থেকে উৎপন্ন তাপের ওপর নিশানা স্থির করতে হয়। তবে আধুনিক যুদ্ধবিমানে সিগনেচার কমানোর জন্য শীতল নোজল, স্বল্প-দৃশ্যমান আবরণ এবং উচ্চ-উচ্চতায় উড্ডয়নের ধরন থাকে, যা শনাক্তযোগ্য তাপ-ছাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ক্যামেরাগুলোও দূরত্ব, আবহাওয়া, কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা এবং দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুর ক্ষুদ্র কৌণিক আকারের কারণে প্রায়ই নির্ভরযোগ্য নয়। যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া ফ্লেয়ার ও ডিকয় ক্ষেপণাস্ত্রের সন্ধানী মাথাকে বিভ্রান্ত করার জন্য তৈরি।
সম্প্রতি এই ধরনের প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে সাফল্যের যে দাবি ইরান করেছে, তাতে সম্ভবত কাছাকাছি দূরত্বে, নিচু উচ্চতায় সংঘর্ষ কোনো হয়েছে—যেখানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাওয়া বা পাইলটের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ার ক্ষণিক সুযোগকে কাজে লাগানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন তবুও এমন সাফল্য বিরল এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিনির্ভর।
গত (শুক্রবার, ৩ এপ্রিল) মধ্য ইরানের আকাশে একটি মার্কিন বিমানবাহিনীর এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল ভূপাতিত হওয়া, যেখানে একজন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্যজন এখনো নিখোঁজ, ইরানের আকাশসীমায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অবাধ নিয়ন্ত্রণের দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়।
ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোকে নিশানা করে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও তার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে জোটবাহিনীর অনুসন্ধান ও ধ্বংস অভিযান চলেছে।





