ইরান বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের মাত্র ৩–৪ শতাংশ সরবরাহ করলেও দেশটির অবস্থান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির কাছে হওয়ায় বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ গ্যাস পরিবাহিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিতে দীর্ঘ সময় পরিবহন ব্যাহত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে।
গতকাল (সোমবার, ২ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইল হামলার পর প্রথম লেনদেনের দিনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। পরে কিছুটা কমে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৭ ডলারে নেমে আসে। ব্যবসায়ীরা মূলত হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন, যেখানে সপ্তাহান্তে ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর বাণিজ্যিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ইরানি ড্রোন হামলার পর সোমবার দেশের সবচেয়ে বড় পরিশোধনাগার বন্ধ করে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস স্থাপনাও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদকদের একটি কাতার এনার্জি এলএনজি উৎপাদন স্থগিত করায় ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে যায়।
সংঘাত শুরুর আগেই তেলের দাম কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বাজার স্থিতিশীল রাখতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকপ্লাস এপ্রিল থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান বাজার অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম জ্যাকসন বলেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং বিশেষ করে যদি ইরানের তেল সরবরাহ বা হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন ব্যাহত হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ইরানের তেল উৎপাদন কত?
ইরান প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা তাকে ওপেকের চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক করেছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদকও।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের মোট তেল মজুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং বিশ্বের মোট মজুতের ১২ শতাংশ ইরানের দখলে। তবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে উৎপাদন সীমিত রয়েছে।
ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করছে এবং এর প্রায় ৯০ শতাংশ চীনে যাচ্ছে। চীনের চাহিদার কারণে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির তেল উৎপাদনের সংখ্যা দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালে ইরানের তেল কোম্পানিগুলো রপ্তানি থেকে প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলে ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-ইআইএ জানিয়েছে।
আরও পড়ুন:
কেন হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে।
ইরান আগেও প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলেও বাস্তবে তা করেনি, কারণ এতে নিজের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
বর্তমান যুদ্ধে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বহু জাহাজ কোম্পানি এই পথ দিয়ে তেল পরিবহন স্থগিত করেছে। এতে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল বাজারে পৌঁছানো বন্ধ হতে পারে, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৩০ শতাংশ।
রাইস্ট্যাড এনার্জির হিসাবে, বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করলেও ৮–১০ লাখ নয়, বরং ৮–১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে যেতে পারে।
রাইস্ট্যাড এনার্জির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রধান জর্জ লিওন বলেন, প্রণালি শক্তি প্রয়োগে বন্ধ হোক বা ঝুঁকির কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হোক—প্রভাব প্রায় একই হবে।
ওপেকপ্লাস কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
গত রোববার ওপেকপ্লাস প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে কেবল উৎপাদন বাড়িয়ে বাজারে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়া সম্ভব হবে না। রপ্তানি পথ সচল থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। ব্লুমবার্গের জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির প্রথম ২৪ দিনে দেশটি দৈনিক প্রায় ৭৩ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব কী হতে পারে?
তেলের দাম কতটা বাড়ে, তার ওপর প্রভাব নির্ভর করবে। সাধারণভাবে তেলের দাম ৫ শতাংশ বাড়লে বড় অর্থনীতিগুলোতে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে। ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলারে উঠলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ০.৬–০.৭ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তা ব্যয় ও আস্থায় চাপ পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ধীর করবে।





