ইতিহাসের দর্পণে ভবিষ্যৎ: এআই মস্তিষ্কে মিলবে কি সংকটের পূর্বাভাস?

এআই প্রতীকী ফটো
এআই প্রতীকী ফটো | ছবি: সংগৃহীত
0

চার’শ বছর আগের কথা। ১৬১৮ সালের ২৩ মে প্রাগ দুর্গে প্রটেস্ট্যান্ট অভিজাতদের একটি দল অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগে দুজন ক্যাথলিক গভর্নরকে তিনতলার জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলেছিল। ঘটনাটি অলৌকিকভাবে বা নেহাত গোবরের স্তূপে পড়ে তারা বেঁচে গেলেও এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। এই ছোট ঘটনা থেকেই শুরু হয়েছিল বোহেমিয়ান বিদ্রোহ, যা পরে ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক ‘থার্টি ইয়ার্স ওয়ার’ বা ত্রিশ বছরের যুদ্ধে রূপ নেয়। লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির জন্ম দিয়েছিল এই সংঘাত।

ইতিহাস এমন অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর, যেখানে ছোট কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে পূর্ব জার্মান কর্মকর্তার একটি ভুল কথায় বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত হওয়া; সারাজেভোতে গাড়িচালকের ভুল বাঁক নেয়ার কারণে আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড খুন হওয়া এবং সেখান থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া; কিংবা তিউনিসিয়ায় ফল বিক্রেতার গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় ‘আরব বসন্ত’র সূচনা—এসবই এর বড় প্রমাণ।

পেছনের দিকে তাকালে হয়তো অনেক সতর্কবার্তাই চোখে পড়ে, কিন্তু কোন স্ফুলিঙ্গটি বিস্ফোরণ ঘটাবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতের বড় ঘটনাগুলো কখন ও কীভাবে ঘটবে, অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল একদিন তার নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারবে।

অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্বাভাস দেয়ার ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। বর্তমানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক পিটার টারচিন ও তার দল মানবসভ্যতার হাজার হাজার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সংকটের মুহূর্তগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। তারা দেখেছেন, সমাজের একটি অংশ যখন গরিব হতে থাকে এবং ক্ষমতার জন্য অভিজাতদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে, তখন বিপ্লব বা গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

টারচিন এই পদ্ধতি ব্যবহার করেই ২০১০ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ২০২০ সালটি হবে চরম বিশৃঙ্খল। করোনা মহামারি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার সেই ধারণা মিলেও গিয়েছিল। এখন তারা এই কাজে এআই ব্যবহারের কথা ভাবছেন।

অপ্রত্যাশিত ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ বা আকস্মিক বড় ঘটনাগুলোর পূর্বাভাস দেয়া প্রায় অসম্ভব হলেও সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এআই নিয়ে বেশ আগ্রহী। ২০২০ সালে মার্কিন গোয়েন্দারা ‘র‍্যাভেন সেন্ট্রি’ নামের একটি এআই ব্যবহার করে আফগানিস্তানে তালেবান হামলার পূর্বাভাস পেয়েছিল, যার নির্ভুলতার হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

অন্যদিকে ‘রম্বাস পাওয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তারা উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পূর্বাভাস আগেই পেয়েছিল। তবে যুক্তরাজ্যের অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের গবেষক আনা ন্যাক মনে করেন, সংঘাতের পূর্বাভাস দেয়ার জন্য এআই এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, ‘নেতাদের বর্তমান চিন্তাভাবনা অনুমান করা সত্যিই খুব কঠিন।’

মার্কিন থিংকট্যাংক ‘দ্য নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট’-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক ইউজিন চাউসোভস্কি এবং তার দল এআই ব্যবহার করে বর্তমান হরমুজ প্রণালির সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তারা সংঘাতের সিমুলেশনে মানুষের পাশাপাশি এআইকেও যুক্ত করে দেখেছেন। চাউসোভস্কি বলেন, ‘এআই প্রযুক্তি তাদের তথ্য বিশ্লেষণের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তবে মজার বিষয় হলো, সিমুলেশনে এআই মানুষের চেয়েও অনেক বেশি রক্ষণশীল আচরণ করে এবং সংঘাত বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলে। এছাড়া জাতিসংঘ ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং সম্ভাব্য সংঘাতের সতর্কবার্তা পেতে এখন এআই ব্যবহার করছে।

অর্থনৈতিক সংকট এড়াতেও এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আন্তোনিও কপোলা এআই ব্যবহার করে একটি মডেল তৈরি করেছেন, যা ২০২০ সালের বাজারদর পতনের পূর্বাভাস আগে থেকেই দিতে পেরেছিল। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ আবার সতর্ক করে বলছেন, প্রযুক্তি খাতের এই উল্লম্ফন বা এআই নিজেই আগামী বৈশ্বিক সংকটের কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও ক্লডের কাছে জানতে চাওয়া হলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

জেমিনির মতে, এআইয়ের কারণে সংকট হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে চ্যাটজিপিটি বলেছে, চলতি শতাব্দীতে এআইয়ের কারণে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ২০ থেকে ৪০ শতাংশ।

অর্থাৎ, মানবসভ্যতার অতীত বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা হয়তো ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতেই চলে যাচ্ছে। যে এআইকে আমরা আগামী দিনের রক্ষাকবচ ও জাদুকরি ‘ক্রিস্টাল বল’ হিসেবে ভাবছি, তা হয়তো একদিন নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারবে। কিন্তু প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষ আমাদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবে, নাকি মানুষের তৈরি এই যন্ত্রই অগোচরে মানবসভ্যতার জন্য নতুন কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের (ব্ল্যাক সোয়ান) স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করবে—সেই উত্তর এখনো ভবিষ্যতের গর্ভেই লুকিয়ে আছে।

—বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে

এএম