ড্রয়িংরুমে বিশাল স্মার্ট টিভি; তবু শিশুর পছন্দ কেন মোবাইল?

স্মার্টফোনের ছোট পর্দায় আটকে পড়ছে শিশুদের শৈশব
স্মার্টফোনের ছোট পর্দায় আটকে পড়ছে শিশুদের শৈশব | ছবি: এআই জেনারেটেড
0

বসার ঘরের দেয়ালে ঝুলছে বড় একটি স্মার্ট টিভি। পরিবারের সবাই সেটি ব্যবহার করে। অথচ ঘরের ছোট্ট সদস্যটি টিভির সামনে না বসে কোণের সোফায় বা বিছানায় গুটিসুটি মেরে ৫-৬ ইঞ্চির একটি মোবাইল ফোনে ডুবে আছে। অনেক পরিবারের কাছেই এটি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য।

প্রথম দেখায় বিষয়টি হয়তো অভ্যাস বা একগুঁয়েমি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এর পেছনে রয়েছে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ, তাৎক্ষণিক আনন্দের আকর্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণবোধের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

শিশুরা বড় পর্দার চেয়ে ছোট মোবাইল স্ক্রিন কেন বেশি পছন্দ করে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, তারা কেবল একটি ডিভাইস ব্যবহার করছে না; বরং একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতরে প্রবেশ করছে।

শিশুদের মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার আকাঙ্ক্ষা। বাস্তব জীবনে তারা প্রায় সবকিছুতেই বড়দের ওপর নির্ভরশীল। কখন খাবে, কখন পড়বে, কখন বাইরে যাবে, অধিকাংশ সিদ্ধান্তই নেয় বাবা-মা।

কিন্তু মোবাইল হাতে নেয়ার পর সেই চিত্র বদলে যায়। কোন ভিডিও দেখবে, কতক্ষণ দেখবে, কখন বদলাবে; সব সিদ্ধান্তই সে নিজে নেয়। একটি আঙুলের স্পর্শেই সে মুহূর্তের মধ্যে অন্য ভিডিও, অন্য গেম বা অন্য জগতে চলে যেতে পারে। এই নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি শিশুর মনে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি তৈরি করে, যা টেলিভিশনের ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুপস্থিত।

স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায়, আধুনিক স্মার্টফোন শিশুদের জন্য কার্যত একটি ‘ডোপামিন জেনারেটর’। নতুন কোনো ভিডিও, অ্যানিমেশন কিংবা গেম দেখার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতি তৈরি করে।

বিশেষ করে ইউটিউব শর্টস, টিকটক কিংবা ফেসবুক রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মে কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন নতুন কনটেন্ট সামনে চলে আসে। একটি ভিডিও ভালো না লাগলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি দেখা যায়। ফলে শিশুর মস্তিষ্ক খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার নতুন উদ্দীপনা পায়।

এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ধীরে ধীরে শিশুদের একাগ্রতা কমে যায়, অপেক্ষা করার অভ্যাস নষ্ট হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, টেলিভিশন একটি পারিবারিক মাধ্যম, কিন্তু মোবাইল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।

আরও পড়ুন:

টিভি চললে আশপাশে পরিবারের অন্য সদস্যদের উপস্থিতি থাকে। কেউ কথা বলে, কেউ মন্তব্য করে, কেউ রিমোট বদলে দেয়। কিন্তু মোবাইল হাতে নিলে শিশুটি যেন নিজের ছোট্ট একটি জগৎ তৈরি করে ফেলে। চোখের খুব কাছের ছোট স্ক্রিন তাকে বাইরের পরিবেশ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেখানে সে একা, স্বাধীন এবং নিজের মতো।

এই ব্যক্তিগত পরিসরও শিশুদের মোবাইলের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ।

টিভি দেখা তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় অভিজ্ঞতা। দর্শক শুধু দেখে। কিন্তু মোবাইল ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শিশু স্ক্রল করছে, ভিডিও থামাচ্ছে, নতুন ভিডিও চালু করছে, গেম খেলছে, চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করছে কিংবা স্ক্রিনে নানা নির্দেশ দিচ্ছে। অর্থাৎ সে শুধু দর্শক নয়, পুরো অভিজ্ঞতার একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

মনোবিজ্ঞান বলছে, মানুষ এমন কাজেই বেশি আগ্রহী হয়, যেখানে তার নিজের অংশগ্রহণ থাকে। এই সক্রিয় সম্পৃক্ততাই মোবাইলকে শিশুদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।

তবে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর মনোযোগ, ভাষা বিকাশ, সামাজিক দক্ষতা, ঘুমের মান এবং দৃষ্টিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাস্তব খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণও কমে যায়।

এ কারণে শুধু মোবাইল কেড়ে নেয়া বা বকাঝকা করাই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন বাস্তব জীবনে এমন বিকল্প আনন্দ তৈরি করা, যা শিশুকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্ক্রিন থেকে দূরে রাখবে।

প্রতিদিন কিছু সময় মাঠে খেলাধুলা, ছবি আঁকা, বই পড়া, গল্প বলা, বিজ্ঞানভিত্তিক ছোট ছোট পরীক্ষা, লেগো বা ব্লক দিয়ে কিছু তৈরি করা কিংবা পরিবারের সঙ্গে বোর্ড গেম খেলার মতো কর্মকাণ্ড শিশুর মস্তিষ্কে প্রাকৃতিকভাবে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।

একই সঙ্গে টিভি দেখাকেও পারিবারিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করা যেতে পারে। সপ্তাহে এক বা দুই দিন সবাই মিলে কোনো সিনেমা বা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখা, পরে তা নিয়ে আলোচনা করা কিংবা শিশুর মতামত শোনা—এসব অভ্যাস তাকে একাকী স্ক্রিন ব্যবহারের বাইরে আনতে সাহায্য করতে পারে।

বাড়িতে কিছু ‘স্ক্রিন-ফ্রি’ নিয়মও কার্যকর হতে পারে। যেমন খাবারের টেবিলে মোবাইল ব্যবহার না করা, শোবার ঘরে স্ক্রিন না নেয়া কিংবা ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা উপদেশের চেয়ে অনুকরণ করে বেশি শেখে। বাবা-মা যদি অবসরের পুরো সময়টুকু মোবাইল স্ক্রলে কাটান, তাহলে শিশুর কাছ থেকে ভিন্ন আচরণ আশা করা কঠিন। পরিবারের বড়দের সচেতন ব্যবহারই শিশুদের সুস্থ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রযুক্তি আজকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই শিশুকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির সঙ্গে তার একটি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা।

এনএইচ