শিল্প-কারখানা
অর্থনীতি

দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হয়েও নানা সংকটে চামড়া শিল্প

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া শিল্প। কোরবানি ঈদের সময় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও ক্রয়ে সরকার উৎসাহ দিলেও, পরবর্তীতে ট্যানারিগুলো কী দরে কিনছে তা নজরদারি করে না কর্তৃপক্ষ। এতে সরকারি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়তে হয় আড়তদারদের। এছাড়াও কোরবানি ঈদের আগেই দাম বেড়ে যায় লবণ ও কেমিক্যালের। এতে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও ব্যর্থ হচ্ছে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা।

শতাব্দীর চল্লিশের দশকে এ দেশে চামড়া খাতের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪০ সালে ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহা নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপন করেন।

১৯৫১ সালে তৎকালীন সরকার ঘোষিত গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঢাকার হাজারীবাগে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত করা হয়। তবে ১৯৯০ সালের পূর্ববর্তী সময়ে ওয়েট ব্লু উৎপাদনেই সীমিত ছিল বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। পরবর্তীতে ক্রাস্ড ও ফিনিসড লেদার, জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে চামড়া খাতের রপ্তানিতে পণ্য বৈচিত্র্য আসতে শুরু করে।

তবে ট্যানারি শিল্প গড়ে ওঠার পর থেকে এই ৭৪ বছরে কেমন আছে এই শিল্প? এই প্রশ্নের উত্তরে ট্যানারি শিল্পের সব গল্পেই হতাশা আর সম্ভাবনার দুটি দিকই মিলবে। চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উৎপাদনে পরিবেশসম্মত কমপ্লায়েন্স না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কখনোই আশানুরূপ হয়নি। আর কোভিড থেকে তার পররবর্তী সময়ে চামড়া খাতের চলমান অগ্রযাত্রায় ভাটা পড়তে থাকে।

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি আয়ের খাত। তবে, যেখানে ২০১৩-১৪ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয় প্রায় ১২৬ কোটি ডলার। পরবর্তী তিন অর্থবছরে কমেছে রপ্তানির পরিমাণ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই আয় আরও কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৭১৩ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম।

২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমে গিয়ে ৭৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তখন, রপ্তানি আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান হারিয়ে চামড়া খাত নেমে গিয়েছিল তৃতীয় স্থানে।

সারা বছর যে পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয় তার প্রায় অর্ধেকের বেশি চামড়া ঈদুল আজহাতে সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা। তবে গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার সঠিক মূল্য না পাওয়াতে এই ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেকেই। সরকারি দামে চামড়া কিনে বিপাকে পড়তে হয় আড়তদারদের। আমরা দেখতে চাই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়িরা কি বলছেন? কেনোই বা এ শিল্প পিছিয়ে আছে? 

চামড়া শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লবন ও ক্যামিকেল। কাঁচা চামড়া ব্লু হোয়েট করতেই দরকার হয় ৪৫ প্রকারের কেমিক্যাল। আর ফিনিশড চামড়া পর্যন্ত প্রয়োজন প্রায় ১০০-১২০ প্রকারের রাসায়নিক দ্রব্য। আর এই পুরোটাই আমদানি করা হয় ইউরোপ থেকে। যার বাৎসরিক মূল্য প্রায় ৭শ' কোটি টাকা। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের উর্ধ্বগতি, এলসি সমস্যাসহ নানা কার প্রতি বছরই কেমিক্যালের দাম বাড়ছে।

রীফ লেদার লিমিটেডের প্রোডাকশনের ( কেমিক্যাল) ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ওমর ফারুক বলেন, 'কেমিক্যাল তো আর সবাই তৈরি করতে পারে না।  ইউরোপের দুই একটা দেশের হাতে আছে। তারা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেছে।'

এবারই প্রথম পিস হিসেবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। ঢাকার বাইরে প্রতি পিস লবণযুক্ত চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য ১ হাজার টাকা ঠিক করা হয়েছে। তবে ট্যানারি মালিকরা এ নির্দেশনা মানেন না বলে অভিযোগ আড়তদারদের। আর এবার তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের প্রস্ততি নিচ্ছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। আতুরারা ডিপোর বড় বড় আড়তে এখন চলছে কোরবানি ঘিরে প্রস্তুতি।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, 'সরকারি বেধে দেয়া দামের মধ্যে আমরা ১ হাজার টাকার ভিতর চামড়া কিনবো কিন্তু আদৌ কি আমরা এই দামের মধ্যে চামড়া বিক্রি করতে পারবো কিনা আমাদের মূলধন ঠিক থাকবে কিনা সেটাই দেখার বিষয় এখন।'

এছাড়াও অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ-এলডব্লিউজি সনদ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না এই দেশের ট্যানারি শিল্প। দেশে প্রায় ২০০ টির বেশি ট্যানারি থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। সেই সব কয়টিই সাভার চামড়া শিল্প নগরীর বাইরে অবস্থিত। শিল্পনগরীর কোনো প্রতিষ্ঠান ট্যানারি শিল্পের মানসনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, 'চামড়া শিল্পকে বাচাতে হলে সারা পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একমাত্র এলডব্লিউজি ছাড়া চামড়া কিনছে চীন। তারা এই সুযোগটা নিচ্ছে।' 

এবার দেখা যাক কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর প্রস্তুতি কেমন। এবছর লবণযুক্ত প্রতিন বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। গত বছরের নির্ধারিত দামের চেয়ে এবারের দাম ৫ টাকা বেশি। অন্যদিকে সারাদেশে খাসির চামড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েসনের তথ্য মতে এ বছর প্রায় এক কোটি পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হবে। তবে তার জন্যে লবণ ও ক্যামিকেলের কারসাজি বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নেয়ারও দাবি জানায় সংগঠনটি।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, 'আমাদের সংরক্ষণের যে সমস্যা এইটা এবারও আছে। আর এবারও ঈদ গরমের সময় হচ্ছে। ফলে দ্রুত কিভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা যায় সেটা হচ্ছে বড় চ্যালেন্জ।'

চামড়া সংরক্ষণে প্রধান উপকরণ লবণ। এ বছর প্রতিটি গরু, মহিষের জন্যে ১০ কেজি এবং ছাগল, ভেড়ার জন্যে ৫ কেজি করে লবণ ধরা হয়েছে। গত বছরের চাইতে এবছর ২ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন চট্টগ্রামে গত ১৫ দিনের ব্যবধানে লবণের মণ প্রতি দাম বেড়েছে দেড়শ থেকে দুইশ টাকা পর্যন্ত, বিক্রি হচ্ছে ৯৮০ থেকে ১০২০ টাকায়। তবে ঢাকায় এখনো লবণের দাম বাড়েনি।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'গত ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও লবণের দাম ছিল ৮শ’ থেকে ৮৭০ টাকা করে। এখন ১ হাজার ২০ টাকা। আর বৃষ্টি হলে তা আরও বেড়ে যায়।'

বিএমসি সল্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জসিমউদ্দিন খন্দকার বলেন, 'যেহেতু ঈদের দিন অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকে তারা এই সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়।'

তবে, প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির ইদের আগে বেড়েছে লবনের দাম, তখন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প-বিসিক বলছে, দাম নিয়ন্ত্রণে কঠিন পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা।

বিসিকের লবণ সেল প্রধান সরোয়ার হোসেন বলেন, 'লবণের মজুদ রয়েছে। সেক্ষেত্রে লবণ পাচ্ছি না, লবণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই।'

এদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি কার্যকারিতা সঠিকভাবে হচ্ছে না। এছাড়াও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে গাফলতি। তবে খুব দ্রুতই চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার সমাধানের আশ্বাস দিলেন শিল্পমন্ত্রী নূরল মজিদ হূমায়ূন। এছাড়াও কয়েক বছরের মধ্যে চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ হিসাবেও আত্বপ্রকাশ করবে বলে দাবি মন্ত্রীর।

শিল্পমন্ত্রী নূরল মজিদ হূমায়ূন বলেন, 'যে আলোকে এইটা করা হয়েছিল তা দিয়ে এত বড় প্রকল্প চালানো সম্ভব না। কাজেই আমরা বিকল্পভাবে ইতালিয়ানদের দিয়ে একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে।'

শুধু চামড়া উৎপাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাসহ সরকারকে আরও এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান সংশ্লিষ্টরা।

ইএ

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর