বৈশ্বিক নানা অস্থিরতার প্রভাবে ভুগছে দেশের জ্বালানি খাত। আমদানিনির্ভরতার কারণেও জ্বালানি ঝুঁকির শঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
একদিকে বেড়েছে আমদানি ব্যয় অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা ঘিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেই দেখা হচ্ছে আশীর্বাদ হিসেবে।
তারই অংশ হিসেবে এলএনজি, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুতের নির্ভরতা কমানোর পক্ষে সরকার। ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। সে লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
কৌশলপত্র অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট নতুন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। যার মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট আসবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আর সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট আসবে ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। এছাড়া বাকিটা আসবে বর্জ্য, বায়ু ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ থেকে। গ্রাফিক্স তালিকা।
কৌশলপত্রে গুরুত্ব পেয়েছে রুফটপ সোলার খাত। কৃষিভিত্তিক জমির স্বল্পতার কারণে সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিল্প ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সোলার স্থাপন একরকম বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। সেই সাথে বিল্ডিং কোড সংশোধন করে ভবনের ছাদে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুতের জন্য সংরক্ষণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতে পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিয়ে সৌর বিদ্যুতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের মোট চাহিদার ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে। যা অনুপ্রেরণা হতে পারে বাংলাদেশের জন্যেও। তবে তার জন্য সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমন্বয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার তাগিদ তাদের।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসাইন খান বলেন, ‘যে টাকাটা ট্যাক্স ইনসেন্টিভ দিতে চাচ্ছেন আপনি, যে জিরো ডিউটি, এটি ডিউটি ড্র-ব্যাক দিয়ে দেন। যে লাইক, ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যারা জেনারেটর জেনারেশন করবে সলারে, তাদের যে পরিমাণ ডিউটি ইম্পোজ করতে হয় ওই টাকাটা ইনসেন্টিভ হিসেবে আপনি দিয়ে দেন। অর্থনৈতিক স্বপ্ন যদি আপনার পূরণ করতে হয়, আপনাকে আগে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে হবে।’
আরও পড়ুন:
অতীতের সরকারগুলো জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সমাধান খুঁজলেও খুব একটা আলোর মুখ দেখেনি কোন প্রকল্প। তবে এবারের পদক্ষেপে কতটুকু সফলতা আসবে? বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির কৌশলপত্র কতটুকুই বা সহায়ক হবে-এমন প্রশ্নে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যুতের চাপ সামলাতে নেট মিটারিং ও স্মার্ট গ্রিডের স্পষ্ট রূপরেখা দেয়াসহ এর লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘নেট মিটারিংয়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে কিন্তু নেট মিটারিং যাতে নিরুৎসাহিত না হয়, সেজন্য চার্জকে যাতে কমিয়ে ধরা যায়, সে ধরনের বিষয়গুলোকে আমরা এখানে লিপিবদ্ধ করবার জন্য অনুরোধ করেছি। সুতরাং যে কৌশলপত্রটি তৈরি হচ্ছে, এটা যতটা সুনির্দিষ্ট হবে, এটাতে যতটা বিভিন্ন এজেন্সির রেসপন্সিবিলিটি সুনির্দিষ্টভাবে করা যাবে, লক্ষ্যভিত্তিক হবে এবং অন্তর্বর্তী পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে, ততো এ ধরনের কৌশলপত্রটি ব্যবহার উপযোগী হবে।’
এদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি অ্যাসোসিয়েশন বলছে, কৌশলপত্র বাস্তবায়নে পরিষেবা সংস্থার তালিকা নির্ধারণ ও শুল্ক সুবিধা সার্বজনীন করতে হবে সরকারকে। এছাড়া অর্থায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট করার দাবি খাত সংশ্লিষ্টদের।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘রেসকো কোম্পানি কে এবং কীভাবে রেসকো কোম্পানির তালিকা নির্ধারণ হবে, সেগুলোও এখনো কিন্তু পরিষ্কার নয়। সোলার বলেন, উইন্ড বলেন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কিন্তু একটা, একটা না একটা প্রণোদনা দিয়ে কিন্তু চলে। আমরা সেই প্রণোদনা কিন্তু এখন বাংলাদেশ মানুষ চাচ্ছে না। শুধু যে শুল্কের সুবিধা দিয়েছেন, সেটা সার্বজনীন করলেই কিন্তু তারা সোলার বসাতে চাচ্ছে। তো ১০ হাজার মেগাওয়াটের যদি একটা কর্মযজ্ঞ হয়, সেক্ষেত্রে অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্সটা এনশিওর করতে হবে।’
দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যা বৈশ্বিক সংকট থেকে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট নয়। সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্রিডে যোগ করা গেছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ।




