ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত কুমিল্লার জনজীবন; ব্যাহত চিকিৎসাসেবা ও শিল্প উৎপাদন

ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত কুমিল্লার জনজীবন
ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত কুমিল্লার জনজীবন | ছবি: এখন টিভি
0

কুমিল্লায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার উৎপাদনেও। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জেলার ১৭ উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এমনকি জটিল রোগীদের অস্ত্রোপচারও ব্যাহত হচ্ছে।

কুমিল্লা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এসময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। অন্যান্য বছর বাড়তি সরবরাহের মাধ্যমে এই চাহিদা সামাল দেয়া হলেও এবার বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আগে কুমিল্লায় ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।

একইসঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লায় সরবরাহ করা প্রায় ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সরবরাহও কমেছে। ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুমিল্লা জোনে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই জোনে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন:

বিদ্যুৎ সংকটে পিডিবির তুলনায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের ভোগান্তি বেশি। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা—সবখানেই ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রচণ্ড গরমে দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর রোগী ও স্বজনরা। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে না। একই কারণে জটিল রোগীদের অস্ত্রোপচারও স্থগিত রাখতে হচ্ছে। এতে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন।

দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিং হওয়ায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জটিল রোগীদের অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘সোমবার লোডশেডিংয়ের মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগীরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এতে চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।’

ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কুমিল্লা পল্লীবিদ্যুৎ-৩ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। মাস দুয়েক আগে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকলেও তখন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই সরবরাহও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।’

আরও পড়ুন:

হাসপাতালের ব্যস্ততম সময় হিসেবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে রোগীর চাপ বেশি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই পিক আওয়ারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে যথেষ্ট চেষ্টা থাকলেও রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

শুধু দাউদকান্দি নয়, জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতেও একই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে যেখানে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সীমিত, সেখানে জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় চিকিৎসকদের পড়তে হচ্ছে বাড়তি বিড়ম্বনায়।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) বিতরণ অঞ্চল, কুমিল্লা-এর প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড মিলে কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলে ৬ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা অন্তত ১৩০০ মেগাওয়াট। তার মধ্যে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বর্তমানে আমরা পাচ্ছি। এর মধ্যে শুধু কুমিল্লা জেলাতেই চাহিদা আছে ১৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট। যার মধ্যে আমরা প্রতিদিনই ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’

প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানান, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকায় এই লোডশেডিং। এছাড়া গরমের সময় বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা থাকে— যে কারণে লোডশেডিং বাড়ছে।

এসএস