তিন মিনিটের ব্যবধানে ভূমিকম্প-বন্যা; নেপাল-চীন সীমান্তে কীসের বিস্ফোরণ?

নেপালের আকস্মিক বন্যা
নেপালের আকস্মিক বন্যা | ছবি: সংগৃহীত
0

তিব্বতে ভূমিকম্পের মাত্র তিন মিনিট পর নেপালের ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। এতে নেপাল-চীন সীমান্তের একাধিক গ্রাম প্লাবিত; ধ্বংস হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রাণ গেছে শতাধিক। তবে এই ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি নেপাল বা চীন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিব্বতে ভূমিকম্পের প্রভাবে হিমবাহ বা পাথরের স্তূপ ধসে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল আজ (বুধবার, ২৫ আগস্ট) দেশটির সংসদে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে বন্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতের ভূখণ্ডে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল গোসাইকুণ্ড থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির প্রাথমিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তে রাসুওয়াগাড়ি সীমান্তবিন্দুর প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হিমবাহ ও পাথরের একটি বড় ধসের পর ধ্বংসাবশেষবাহী পানি লেন্দে নদীতে ঢুকে পড়ে। পরে সেই পানি তিমুরে হয়ে ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হয়।

তবে ঠিক কী কারণে এই ধস বা পানিবিস্ফোরণ ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

আরও পড়ুন:

নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নেপালের লাসায় কনসাল জেনারেল লক্ষ্মী প্রসাদ নিরৌলা জানিয়েছেন, বন্যায় সড়ক, যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সীমান্তে মোতায়েন নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করতে পারছে না।

নিরৌলার ভাষ্য, হিমবাহ থেকে আকস্মিক পানিপ্রবাহ বা গ্লেসিয়াল আউটবার্স্টের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে এখনো তা নিশ্চিত নয়। তিব্বতের মানসসরোবর ও আলি এলাকায় মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেটিও বন্যার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বন্যার প্রকৃত কারণ জানতে চীন ও নেপালের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বেইজিংয়ের বিজ্ঞানীরাও বন্যার উৎস ও কারণ নির্ধারণে কাজ করছেন।

এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় ভয়াবহ বন্যা

ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় এমন বিপর্যয় এবারই প্রথম নয়। গত বছরের জুলাইয়েও চীনের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একটি হিমবাহের ওপর তৈরি হওয়া হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ ঢল নেমেছিল। রাসুওয়াগাড়ি সীমান্তবিন্দুর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উজান থেকে নেমে আসা সেই ঢল লেন্দে খোলা ও ভোতেকোশি নদী দিয়ে নেপালে প্রবেশ করে।

প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার ডাউনস্ট্রিম এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রাণ হারান অন্তত ১১ জন। ধ্বংস হয়ে যায় রাসুওয়াগাড়ির মিতেরি বা ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ।

আরও পড়ুন:

ওই ঘটনার পর নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী বন্যা, ভূমিধস এবং সম্ভাব্য হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের ঝুঁকি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।

ফলে দুর্যোগপ্রবণ এই সীমান্তে কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা না থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক বন্যার পর নেপাল সরকার ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের একাধিক সতর্কবার্তা দিয়েছে। সম্ভাব্য নতুন ঢলের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।

সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক

ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনকাজে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহকে ফোন করে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতিতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি জানান, কঠিন এই সময়ে ভারতীয় জনগণ নেপালের পাশে রয়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত ইতোমধ্যে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৭ ও সি-১৩০ উড়োজাহাজে উদ্ধার সরঞ্জাম, ত্রাণসামগ্রী ও ওষুধ পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলার বিশেষ দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চীনও নেপালকে সম্ভাব্য সবধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। দেশটি তাৎক্ষণিক নগদ সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে।

আরও পড়ুন:

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও নেপালকে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকও জরুরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটির নেপাল কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেভিড সিসলেন জানিয়েছেন, বিভিন্ন উৎস থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি রুপি জরুরি সহায়তা হিসেবে মবিলাইজ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই অর্থ ঋণ, অনুদান নাকি অন্য কোনো অর্থায়নের মাধ্যমে আসবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বন্যাকবলিত রাসুওয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের পৌর এলাকাগুলোকে ‘সংকটাপন্ন অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে নেপাল সরকার।

উদ্ধার তৎপরতায় চীনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের খুঁজে বের করা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি আগাম সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার এবং উদ্ধারকাজে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংও নিখোঁজ ও হতাহতের সংখ্যা দ্রুত নিশ্চিত করে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়াতেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চীনের তিব্বত অঞ্চলও বুধবার উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও জনবল মোতায়েন করেছে।

তবে ভয়াবহ এই বন্যার পেছনে ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, হিমবাহ ধস নাকি একাধিক প্রাকৃতিক ঘটনার সম্মিলিত প্রভাব—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। দুর্গম সীমান্তে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন ও স্যাটেলাইটসহ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণের পরই দুর্যোগের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

—কাঠমান্ডু পোস্ট অবলম্বনে

এনএইচ