সব সূত্রই জানিয়েছে, আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে এই আলোচনা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার রয়টার্স জানিয়েছিল, গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে ইসলামাবাদে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সোমবার সৌদি আরবে হামলা চালানোর পর পরমাণু অস্ত্রধারী পাকিস্তান ইরানকে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে তারা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবেই বিবেচনা করবে।
চলতি বছর ইরানের ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে কুয়েত। ফলে দেশটির সঙ্গে পাকিস্তানের যেকোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।
২০২৩ সাল থেকে প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সীমিত পরিসরে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে কুয়েতের। তবে দেশটি এখন সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তির মতো ইসলামাবাদের কাছ থেকে শক্তিমত্তার প্রদর্শন চাইছে। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের একজন সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত অন্যান্য সুবিধা’ থাকবে।
তবে পাকিস্তান এত দূর যেতে রাজি কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের চুক্তিটি রিয়াদের সঙ্গে কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফসল।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিষয়ক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কুয়েতের ইচ্ছার তালিকায় সবকিছুই রয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই: এই পর্যায়ে আমরা যুদ্ধরত সেনা মোতায়েনের কথা বিবেচনা করছি না এবং করতেও পারি না।’
মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিরক্ষা কেনাকাটাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে। তবে সূত্রটি বলেছে, ‘এটি স্পষ্ট নয় যে, এই আলোচনা পুরোদস্তুর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে গড়াবে কি না।’
রয়টার্স পাকিস্তানের চারটি সূত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে তাদের কেউই প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন না। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
প্রতিরক্ষার বিকল্পের খোঁজে
গত এক বছরে পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা চুক্তির সুবিধার দিকটি বুঝতে পেরেছে।
পাকিস্তান বিশাল একটি সামরিক বাহিনী পরিচালনা করে এবং নিজস্ব যুদ্ধবিমানও তৈরি করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার বিকল্প বা সহযোগী হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে সম্ভাব্য একটি অংশীদার হয়ে উঠেছে দেশটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্র হিসেবে কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ বেড়েছে।
কুয়েতের নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র জানিয়েছে, কুয়েতে পাকিস্তানকে একটি নিরাপদ বাজি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্রটি বলেন, ‘তারা ইতিমধ্যে সৌদিদের সঙ্গে রয়েছে, প্রতিরক্ষা উন্নয়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তারা সুন্নি মুসলিম, আমেরিকানদের সঙ্গেও তাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এটি অন্য কিছু বিকল্পের মতো ততটা স্পর্শকাতর নয়।’
সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের বিদ্যমান চুক্তির বাইরে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, বাহরাইনও একই ধরনের চুক্তিতে আগ্রহী। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, জর্ডানও অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ চুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বুটের বদলে ব্যারেল
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিকে জরুরি বিনিয়োগ নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসেবে দেখছে পাকিস্তান।
কুয়েতের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতা চাইছে ইসলামাবাদ। এটি পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তেল ও জ্বালানির মজুত বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, কুয়েত পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ডেড ফুয়েল স্টোরেজ চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করছে। এটি দুই দেশের মধ্যে সরকার-থেকে-সরকার (জি-টু-জি) পর্যায়ে বিদ্যমান ডিজেল সরবরাহ চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, এমন প্রস্তাব পাকিস্তানের নেতৃত্বকে বৃহত্তর প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে অগ্রসর হতে যথেষ্ট আকর্ষণীয় হতে পারে। তারা যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমলেই এই আলোচনার গতি বাড়ার আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি হয়তো কেবলই একটি বাসনায় পরিণত হতে পারে। সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘পাকিস্তানকে অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।’





