ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা; বদলে যাচ্ছে উপসাগরের ভূরাজনীতি

দ্য ডনের বিশ্লেষণ

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য | ছবি: সংগৃহীত
0

সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধ আংশিকভাবে থেমেছে। ইরানের পাল্টা জবাবে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তির দিকেই এগোন। জি-৭ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে বৈশ্বিক মন্দা হতে পারে এবং তিনি ‘মহামন্দার জন্য দায়ী প্রয়াত হার্বার্ট হুভার’-এর মতো হতে চান না।

হরমুজ প্রণালির অবরোধ তেল, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিশাল ইকোসিস্টেমকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল। সার সরবরাহ আটকে যাওয়ায় এই অঞ্চলসহ বাইরের কৃষি খাতেও চাপ পড়ে। বৈশ্বিক কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাকে নিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্কবার্তা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জরিপ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ছিল অজনপ্রিয়। নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এটি রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছিল।

এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো নিরাপত্তা মডেল আর কার্যকর নয় এবং পরিস্থিতি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর জায়গায় কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক শৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে?

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিপরীতে ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে সেখানে ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়েছিল। ওই ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলা এই দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোগত ও ভৌগোলিক দুর্বলতা তুলে ধরেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন তাদের সামনে তিনটি বিকল্প রয়েছে এক. ইরানকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য করা; দুই. ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা; অথবা তিন. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভবিষ্যতে যেকোনো সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকা।

তবে জিসিসির অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক মতভেদের ইতিহাস দীর্ঘ। জোটের ঐক্যের প্রধান চ্যালেঞ্জ সৌদি আরবের প্রভাব এবং কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসন রক্ষার ইচ্ছার মধ্যকার ভারসাম্য। এছাড়া হুমকি সম্পর্কে তাদের ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধি রয়েছে। সৌদি আরব ও বাহরাইন যেখানে ইরানকে নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে দেখে, সেখানে আরব আমিরাত দুবাইয়ের মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যকেন্দ্রিক সম্পর্ক বজায় রাখতো।

পাকিস্তানের জন্য উপসাগরের এই বদলে যাওয়া পরিবেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পশ্চিম সীমান্ত বজায় রাখার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়। ইসলামাবাদ কৌশলগত সংযমের নীতি অনুসরণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ইরানবিরোধী ব্লকে যোগ দিলে পাকিস্তান আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে ইসলামাবাদ জিসিসি দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করলেও তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো কাঠামোর অংশ হতে চাইবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণেই বর্তমান সংঘাতে মধ্যস্থতায় পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

উপসাগরের ভবিষ্যতের তিন দৃশ্যকল্প

প্রথমটি হচ্ছে ‘মিনি-লেটারাল হাব’। এই দৃশ্যকল্পে সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হবে না। বরং অঞ্চলটি ওভারল্যাপিং, লেনদেনভিত্তিক নেটওয়ার্কে বিভক্ত হয়ে পড়বে। সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াবে। এটি একটি নমনীয় ও অনিশ্চিত শৃঙ্খলা তৈরি করবে।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘সুন্নি বহির্ভূত জোট’। এই দৃশ্যকল্পে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যাপক চুক্তিতে পৌঁছাবে। কিন্তু ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে চাপ দিতে পারে এবং উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানকে বাদ দিয়ে সম্প্রসারিত সুন্নি প্রতিরক্ষা জোট গঠন করতে পারে। এতে ইরান, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্বরান্বিত করতে পারে।

তৃতীয়টি হচ্ছে ‘পান-গালফ কনসার্ট’। এই দৃশ্যকল্পে জাতিসংঘ-চীনের কূটনৈতিক সমর্থনে জিসিসির ছয় সদস্য, ইরাক ও ইরানকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পারস্য উপসাগর নিরাপত্তা ও সহযোগিতা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে তুরস্ক ও পাকিস্তান বাইরের পর্যবেক্ষক গ্যারান্টর হিসেবে কাজ করবে। ১৯৭৫ সালের হেলসিংকি চুক্তির আদলে সদস্যরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মানের চুক্তি সই করবে।

চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় ঝুঁকে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে অনিচ্ছুক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন উপসাগরকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচনা করে। তাই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অদূর ভবিষ্যতে সীমিত মতপার্থক্য ও কাঠামোগত অবিশ্বাসের মধ্য দিয়েই চলবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে হলে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে কাঠামো তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এসব মৌলিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অঞ্চলটি অস্থিতিশীল ও সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকবে।

এএম